নিজস্ব প্রতিবেদক:
আমার অনেক শত্রু হয়ে গেছে, যেকোনো সময় তারা আমাকে মেরে ফেলতে পারে— সব সময় এমন আশঙ্কাই করতেন গুলিতে নিহত স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম।
সুরাইয়া বেগম বলেন, সে (মুছাব্বির) সব সময় বলত— তার অনেক শত্রু হয়ে গেছে, যেকোনো সময় তাকে মেরে ফেলা হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট করে কারো নাম বা কোনো হুমকির বিষয়ে সে কখনো আমাদের বিস্তারিত কিছু বলেনি। মুছাব্বির খুব ভালো মানুষ ছিলেন। রাজনৈতিক মামলা ছাড়া কারো সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা ছিল না। আসলে তার এই অতি সরলতাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বাসায় সে প্রায়ই বলত— আমার অনেক শত্রু হয়ে গেছে, দেখবা হুট করে মারা যাব আর তোমরা কিছুই বুঝতে পারবা না। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম কিংবা ভয়ংকর কোনো আশঙ্কার উৎস সম্পর্কে সে কখনো কিছু প্রকাশ করেনি। অনেক সময় বিষয়টি সে হালকাভাবে বলত, তাই আমরাও অতটা গুরুত্ব দেইনি।
নিহত মুছাব্বিরকে দেওয়া কোনো হুমকি বা এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে সুরাইয়া বলেন, সুনির্দিষ্ট হুমকির কথা সে কখনো আমাদের বলেনি। শুধু শত্রুদের হাতে মারা যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলত। এ নিয়ে সে থানায় কোনো জিডিও করেনি।
মুছাব্বিরের পরিবার পশ্চিম কারওয়ান বাজারের গার্ডেন ভিউ এলাকায় নিজেদের বাড়িতে বসবাস করত। দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি সেই বাড়িতেই থাকতেন। তার বাবার নাম খলিলুর রহমান।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক মামলার কারণে তিনি বিভিন্ন সময়ে পাঁচবার কারাভোগ করেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে জামিনে মুক্তি পান মুছাব্বির। তবে জামিনে বের হওয়ার পর তিনি কারওয়ান বাজারের বাসায় থাকাকে নিরাপদ মনে করতেন না। নিরাপত্তার খাতিরে পরে পরিবার নিয়ে মেরাদিয়া এলাকায় বসবাস শুরু করেন। এ ছাড়া, মাঝেমধ্যে তিনি বসুন্ধরার পেছনে কাজীপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতেও থাকতেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারি ও পানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কারা তাকে হত্যা করতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে সুরাইয়া বেগম বলেন, “এখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারিনি। তার কোনো ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। ঘটনার সময় তার কাছে দুটি মোবাইল ফোন ছিল, কিন্তু ফোন দুটি পাওয়া যায়নি। তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছি। এখন পুলিশ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করবে। আমার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার চাই। কোনো পরিবারেই যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে।”
এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈনু মারমা বলেন, “আজ সকালে তার(মুছাব্বির) স্ত্রী তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নম্বর-৫। তবে এই হত্যাকাণ্ড কে বা কারা, কী উদ্দেশ্যে ঘটিয়েছে— সে বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। এখন আসামিদের নামপরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছি। আশা করছি, খুব শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করতে পারব।”
এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, “কেন তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই।”
কয়েক দিন আগে চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়ে কারওয়ান বাজারে মারামারি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনার সঙ্গে মুছাব্বিরের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা সব বিষয় নিয়ে তদন্ত করছি। এ ঘটনায় সবদিক বিবেচনা করে আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”
এ প্রসঙ্গে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানান, “তার স্ত্রীর কাছ থেকে আমরা কিছু তথ্য পেয়েছি। তার স্ত্রী জানিয়েছেন, সে (মুছাব্বির) প্রায়ই যেকোনো সময় তাকে মেরে ফেলা হতে পারে— এমন আশঙ্কার কথা বলতেন। তবে এ বিষয়ে তিনি থানায় কোনো জিডি করেননি। আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছি, সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।”
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে মুছাব্বিরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. আয়শা পারভীন ময়নাতদন্ত করেন। পরে সেখান থেকে দলীয় কার্যালয়ে তার জানাজা হয়। দলীয় কার্যালয় থেকে তাকে নিজ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে আবার জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এর আগে তেজগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. হায়দার আলী মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিহতের পেটের ডান পাশে আধা ইঞ্চি পরিমাণ একটি ছিদ্র রয়েছে। ডান হাতের কনুইয়ের পেছনে একটি ছিদ্র এবং বাম পায়ের হাঁটুতে ছিলা জখম পাওয়া গেছে। আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করে মুছাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার সময়কার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মাথায় মাফলার পরা তিন ব্যক্তি মুছাব্বিরকে গুলি করে দ্রুত দৌড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলির সময় আশপাশের লোকজন দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। তবে অন্ধকারের কারণে তাদের মুখ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়নি।
গতকাল বুধবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে হোটেল সুপারস্টারের পাশে আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলিতে অজ্ঞাত পরিচয়ের বন্দুকধারীরা মুছাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানা ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন। পরে স্থানীয়রা দুজনকে উদ্ধার করে বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে গুলিবিদ্ধ আবু সুফিয়ান মাসুদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। আজ সকালে তার অস্ত্রোপচার হয়েছে; বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
একে