পবিপ্রবি প্রতিনিধি :
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) রেজিস্ট্রার এবং বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাবের যুগ্ম সম্পাদক ও সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. ইকতিয়ার উদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি ২০২৬) সকালে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি অংশের চাপ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস সফর শেষে দেশে ফিরে গত ২৬ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে অবস্থানকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত শিক্ষক প্রফেসর মো. জামাল হোসেন কর্তৃক তিনি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন এবং হত্যার হুমকির মুখে পড়েন।
পরবর্তীতে ক্যাম্পাসে ফিরে তিনি নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণে নিয়মিত দপ্তরে উপস্থিত হতে না পেরে বাসায় অবস্থান করছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলামের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে নিরাপত্তা দাবি করলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
ক্যাম্পাসের একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের শোকাবহ সময়েই পবিপ্রবির উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহানের প্রত্যক্ষ মদদে প্রফেসর জামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের একটি অংশ রেজিস্ট্রার ড. ইকতিয়ার উদ্দিনকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ড সভায় মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এবিএম সাইফুল ইসলামের বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি এবং কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই প্রফেসর জামাল হোসেনের স্ত্রী জিনাত নাসরীন সুলতানার সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ অনুমোদন না হওয়াকে কেন্দ্র করে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। উল্লেখ্য, ড. এবিএম সাইফুল ইসলাম ও প্রফেসর জামাল হোসেন উভয়ই উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
বিশ্বস্ত সূত্রে আরও জানা যায়, উপ-উপাচার্যের কক্ষে একাধিক বৈঠকের পর তারই নির্দেশে কর্মকর্তা মো. লোকমান হোসেন মিঠু ও মাহমুদ আল জামান রেজিস্ট্রারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্যে হামলা চালান। তবে রেজিস্ট্রারকে না পেয়ে তার একান্ত সচিব শাখার কর্মকর্তা শাকির আহমেদকে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়।
ক্যাম্পাস সূত্রের দাবি, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ক্যাম্পাসে একটি ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, যাতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তিনি ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষক উপাচার্য পদে আগ্রহ প্রকাশ না করেন।
এদিকে পবিপ্রবিতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৪৫৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার ঘিরে কমিশন বাণিজ্য এখন ‘টক অব দ্য ক্যাম্পাস’। অভিযোগ রয়েছে, কাজ হস্তান্তরের আগেই বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল দেখা দিয়েছে। নিয়মিত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকা সত্ত্বেও বিধিবহির্ভূতভাবে প্রফেসর জামাল হোসেনকে ‘বিশেষ কর্মকর্তা’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান, বিশেষ কর্মকর্তা প্রফেসর জামাল হোসেন, প্রকল্প পরিচালক ওবায়দুল ইসলাম, এবং পরিকল্পনা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার মিয়াকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।
এছাড়া কর্মকর্তা ও কর্মচারী সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদোন্নতির বিনিময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, এসব অর্থের একটি অংশ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাত।
ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে পবিপ্রবিতে চরম ভয়ভীতি ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। তাদের দাবি, বর্তমান প্রশাসনের সময়কালের সকল নিয়োগ, পদোন্নতি, টেন্ডার ও উন্নয়ন কার্যক্রমের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি।
একে