আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপগুলো সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ার হারের চেয়েও দ্রুত ডেবে যাচ্ছে। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই তথ্য। গবেষকেরা বলছেন, নীল নদ, আমাজন ও গঙ্গার মতো বদ্বীপগুলো ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের উচ্চতা বাড়লে যে ক্ষতি হতো, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে বদ্বীপগুলো দেবে যাওয়ার কারণে। এর ফলেই মূলত জমি হারিয়ে যাচ্ছে, উপকূলীয় বন্যা বাড়ছে এবং সাগরের নোনাপানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
গবেষকেরা বলছেন, বদ্বীপগুলোর এভাবে ডেবে যাওয়ার প্রধান কারণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন। এ ছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নদীতে পলিপ্রবাহ কমে যাওয়াও এর জন্য দায়ী।
গবেষণার ফলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বদ্বীপগুলো এখন 'দ্বিমুখী সংকটে' পড়েছে। একদিকে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি, অন্যদিকে মাটি দেবে যাওয়া—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে বিশ্বের বড় বড় শহর ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বদ্বীপ তলিয়ে যাওয়ার পেছনে মানুষের সৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন। গবেষণাপত্রটির সহলেখক ও ভার্জিনিয়া টেকের জিওফিজিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মানুচেহর শিরজাই বলেন, 'আমাদের জানামতে, বদ্বীপগুলোর দেবে যাওয়া নিয়ে এটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বিশদ ও বড় পরিসরের গবেষণা।'
সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৪০টি বড় বদ্বীপের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকেরা। গত বুধবার নেচার জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০টি বদ্বীপের মধ্যে ১৮টিরই ডেবে যাওয়ার বার্ষিক হার সাগরের পানি বাড়ার হারের চেয়ে বেশি। বর্তমানে সাগরের পানি বছরে গড়ে প্রায় ৪ মিলিমিটার করে বাড়ছে।
গবেষকেরা বলছেন, রিও গ্র্যান্ডে ছাড়া বাকি সব কটি বদ্বীপের কোনো না কোনো অংশ সাগরের পানি বাড়ার হারের চেয়েও দ্রুতগতিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৯টি বদ্বীপের ৯০ শতাংশেরও বেশি এলাকা দেবে গেছে। এই তালিকায় মিসিসিপি ও নীল নদের সঙ্গে রয়েছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রও।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এশিয়ার বদ্বীপগুলোর। থাইল্যান্ডের চাও ফ্রায়া, ইন্দোনেশিয়ার ব্রান্তাস এবং চীনের ইয়োলো রিভার বদ্বীপ বছরে গড়ে ৮ মিলিমিটার করে ডুবছে, যা সাগরের পানি বাড়ার হারের দ্বিগুণ।
অধ্যাপক শিরজাই দুটি প্রধান সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের উচ্চতা বাড়ার চেয়েও মাটি ডেবে যাওয়ার কারণে উপকূলীয় ঝুঁকি বাড়ছে অনেক দ্রুত। দ্বিতীয়ত, যেসব বদ্বীপ সবচেয়ে দ্রুত ডুবছে, সেগুলোর মোকাবিলার সক্ষমতা বা সম্পদ সবচেয়ে কম।
বিশ্বজুড়ে বদ্বীপ অঞ্চলগুলোতে প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ কোটি মানুষের বসবাস। বিশ্বের ৩৪টি মেগাসিটির ১০টিই গড়ে উঠেছে এসব এলাকায়। সঙ্গে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব বন্দর। ফলে বদ্বীপ ডেবে গেলে উপকূলীয় ভূমি বিলীন হওয়া বা ঘন ঘন বন্যার মতো বিপর্যয় অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় আঘাত হানবে।
বিপুল জনসংখ্যাই বদ্বীপ দেবে যাওয়ার অন্যতম কারণ। কারণ, শহরের বিশাল সব স্থাপনা মাটির ওপর যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, তাতে মাটি সংকুচিত হয়ে যায়। পাশাপাশি বিশাল এই জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভ থেকে প্রচুর পানি তোলা হয়। এতে মাটির নিচের স্তর ফাঁকা হয়ে যায় এবং ওপরের চাপে তা আরও দেবে যায়।
অধ্যাপক শিরজাই বলেন, যেসব বদ্বীপে দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে, সেখানে শহরের অপরিকল্পিত বৃদ্ধি ভূমি দেবে যাওয়াকে ত্বরান্বিত করছে। তবে শুধু শহরে ব্যবহারের জন্য নয়, কৃষি ও শিল্পের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনও বদ্বীপ তলিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।
তিনি আরও বলেন, 'ভূগর্ভস্থ পানি তুললে যে মাটি দেবে যায়, তা স্থানীয়ভাবে আমাদের জানা ছিল। কিন্তু বিশ্বজুড়ে মানুষের সৃষ্ট অন্যান্য কারণের তুলনায় এটিই যে এতটা প্রভাবশালী বা প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা গবেষণায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।'
বদ্বীপগুলো তলিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো নদীতে পলিপ্রবাহ কমে যাওয়া। নদী সাধারণত সাগরে গিয়ে পড়ার সময় প্রচুর পলি বয়ে নিয়ে যায়, যা প্রাকৃতিকভাবে মাটির উচ্চতা বজায় রাখতে এবং সাগরের পানি বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় সাহায্য করে। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ ও নদী শাসনের কারণে এই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাঁধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ বা লভি এবং ভূমিক্ষয়ের কারণে ১৯৩২ সাল থেকে মিসিসিপি বদ্বীপের প্রায় ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি হারিয়ে গেছে।
অধ্যাপক শিরজাই মনে করেন, বদ্বীপ ডেবে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো যেহেতু মানুষের সৃষ্টি, তাই এর সমাধানও মানুষের হাতেই রয়েছে। তিনি বলেন, 'এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, ভূমি ধসে পড়া বা ডেবে যাওয়া অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।'
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি দেশগুলোকে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বৃষ্টির পানি বা শোধন করা বর্জ্য পানি দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আবার পূর্ণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রিত বন্যার মাধ্যমে পলি জমার সুযোগ তৈরি করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভারী অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করলে সুফল মিলবে।
অধ্যাপক শিরজাই বলেন, 'বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এমআই