আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় আসতে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর করার পর তিনি বলেছেন, আলোচনায় বসার জন্য তেহরানের 'সময় ফুরিয়ে আসছে'।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, একটি 'বিশাল আর্মাডা (নৌবহর)' অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং পূর্ণ 'শক্তি ও লক্ষ্য নিয়ে' ইরানের দিকে যাচ্ছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তাদের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো ধরনের স্থল বা জল আক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুত। তিনি বলেন, তাদের সেনাদের 'আঙুল এখন ট্রিগারেই আছে'; যেকোনো আগ্রাসনের 'তাৎক্ষণিক ও জোরালো' জবাব দেওয়া হবে।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে যে অভিযোগ তুলে আসছে, তেহরান তা বারবার অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এলো, যখন তিনি চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো নজিরবিহীন ও নৃশংস দমন-পীড়ন ঠেকাতে ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ইরানি মুদ্রার ব্যাপক দরপতনের পর দেশটিতে এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। তবে শিগগিরই তা বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, 'সাহায্য আসছে।' তবে পরে সুর বদলে বলেন, নির্ভরযোগ্য সূত্রে তিনি খবর পেয়েছেন যে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) বলছে, ডিসেম্বরের শেষ দিকে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৩০১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে তারা।
সংস্থাটি আরও জানায়, প্রায় তিন সপ্তাহ ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়েছে। তবে আরও ১৭ হাজার মৃত্যুর খবর এখন বর্তমানে যাচাই করে দেখছে তারা।
অন্যদিকে নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) বলছে, নিহতের মোট সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলোতে মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ এক পোস্টে তিনি লিখেন: 'আশা করি ইরান দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসবে এবং ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তিতে পৌঁছাবে—কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়।'
তিনি আরও বলেন, এবার পারস্য উপসাগরে পাঠানো মার্কিন নৌবহরটি ভেনিজুয়েলায় পাঠানো বহরের চেয়েও বড়। ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার আগে সেখানেও একই ধরনের সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
গত জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলা ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলার প্রসঙ্গ টেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন: 'পরবর্তী হামলা হবে আরও ভয়াবহ! সেই পরিস্থিতি ফের তৈরি হতে দেবেন না।'
বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরান সরকার 'সম্ভবত এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় আছে।'
আইআরআইএস শহীদ বাঘেরি। ছবি: ম্যাক্সার টেকনোলজি
এদিকে ট্রাম্পের সর্বশেষ হুঁশিয়ারির প্রতিক্রিয়ায় আরাগচি বলেন, 'ইরান সব সময় পারস্পরিক লাভজনক ও ন্যায়সংগত পারমাণবিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তা হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে এবং যেকোনো ধরনের বলপ্রয়োগ, হুমকি ও ভয়ভীতিমুক্ত।'
এদিকে ইরানের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, বিভিন্ন পর্যায়ে 'বার্তা আদান-প্রদান' চললেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হচ্ছে না।
বিবিসি ভেরিফাই ওপেন সোর্স টুল ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক মোতায়েন পর্যবেক্ষণ করেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, জর্ডানের মুওয়াফ্ফাক বিমান ঘাঁটিতে অন্তত ১৫টি যুদ্ধবিমান পৌঁছেছে।
এছাড়া জর্ডান, কাতার ও ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতেও মার্কিন সামরিক বিমানের সংখ্যা বেড়েছে। বিবিসি ভেরিফাই মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক ডজন কার্গো বিমান ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের উপস্থিতি চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি ফ্লাইট রাডার২৪ ট্র্যাকিং সাইটে ইরানের আকাশসীমার কাছাকাছি ড্রোন ও পি-৮ পোসাইডন গোয়েন্দা বিমান উড়তে দেখা গেছে।
একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বিবিসি ভেরিফাইকে নিশ্চিত করেছেন, ট্রাম্প যে 'আর্মাডা'র কথা বলেছেন, তার নেতৃত্বে রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন; সেটি ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে।
সোমবার ফ্লাইট রাডার২৪-এ একটি অস্প্রে বিমানের ট্র্যাকার দেখা গেছে। সেটি পারস্য উপসাগরের কোনো এক অফশোর এলাকা থেকে উড্ডয়ন করে ওমানে অবতরণ করেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন রণতরী লিঙ্কন আশপাশেই কোথাও অবস্থান করছে।
সামরিক বিশ্লেষক মেগান সাটক্লিফ বলেন, গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নৌ ও বিমান বাহিনীর শক্তি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে।
স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত দুটি মার্কিন গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ও তিনটি যুদ্ধজাহাজ গত কয়েক মাস ধরে বাহরাইনে অবস্থান করছে।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তাদের উপকূলের অদূরে আইআরআইএস শহীদ বাঘেরি নামক ড্রোনবাহী জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে।
২০১৫ সালে কয়েকটি বিশ্বশক্তির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের জন্য ৩.৬৭ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ ছিল—যা মূলত বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া দেশটির ফোরদো প্ল্যান্টে ১৫ বছরের জন্য যেকোনো ধরনের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখার কথা ছিল।
তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। তার যুক্তি ছিল, এই চুক্তি ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে বিরত রাখতে যথেষ্ট নয়। এরপর তিনি ইরানের ওপর ফের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন; এতে দেশটির অর্থনীতির অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরানও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করতে শুরু করে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে তারা বিধিনিষেধ মানা বন্ধ করে দেয়।
এমআই