নিজস্ব প্রতিবেদক:
আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলে বিএনপি প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে ঐক্য সরকার গঠন করবে না বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির এককভাবে নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী থাকার কথা জানিয়ে সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, তার দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে এবং সরকার গঠনের জন্য অন্য কোনো দলের সহায়তার প্রয়োজন হবে না।
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তার মায়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রায় দুই দশকের নির্বাসন শেষে গত ডিসেম্বরে লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তিনি।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী একসময় নিষিদ্ধ থাকলেও বর্তমানে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠন করেছিল। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা আবারও জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনে প্রস্তুত। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে কয়েক মাসব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের বৃহৎ তৈরি পোশাক খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতেই অবস্থান করছেন।
নিজ দলীয় কার্যালয় থেকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তারেক বলেন, 'আমি কীভাবে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরকার গঠন করব? তাহলে বিরোধী দলে কে থাকবে?'
তিনি আরও বলেন, 'আমি জানি না তারা কতটি আসন পাবে। তবে তারা যদি বিরোধী দলে থাকে, আমি আশা করি তারা একটি ভালো বিরোধী দল হবে।'
তারেক রহমানের সহযোগীরা জানিয়েছেন, ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয়ের ব্যাপারে বিএনপি আত্মবিশ্বাসী। দলটি সরাসরি ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, বাকি আসনগুলোতে তাদের মিত্ররা লড়ছে।
তারেক রহমান নির্দিষ্ট কোনো আসনসংখ্যার কথা না বললেও বলেন, 'আমরা আত্মবিশ্বাসী যে সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন আমাদের থাকবে।'
সব জনমত জরিপেই বিএনপির জয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই জোটে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা 'জেন-জি' বা তরুণ প্রজন্মের একটি দলও রয়েছে।
বৈশ্বিক সুসম্পর্ক
মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছর ঢাকার একটি আদালত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
নির্বাচনে জয়ী হলে ভারত থেকে সরে চীনের দিকে ঝুঁকবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সক্ষম এমন অংশীদারদের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান তিনি।
তিনি বলেন, 'আমরা যদি সরকারে থাকি, আমাদের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য আনতে হবে, যাতে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং মানুষ ভালো জীবন পায়।'
তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে যারা আমাদের জনগণ ও দেশের জন্য উপযুক্ত প্রস্তাব দেবে, আমরা তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করব—কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে নয়।'
শেখ হাসিনার সন্তানরা বিদেশ থেকে ফিরে রাজনীতি করতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, 'জনগণ যদি কাউকে গ্রহণ করে, জনগণ যদি স্বাগত জানায়, তাহলে রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে।'
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তার পতনের আগে ও পরবর্তী সময়ে দলটির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা এবং পরিবারের সদস্যরা বিদেশে চলে যান।
নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের রাখার আশ্বাস
অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। প্রতিবেশী বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে পড়ে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর জানায়, 'অসংখ্য চ্যালেঞ্জের কারণে' শরণার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সম্পদ বরাদ্দ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তার আহ্বান জানায়।
তারেক রহমান বলেন, তিনিও চান রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক, তবে সেটি অবশ্যই নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার পর।
তিনি বলেন, 'আমরা চেষ্টা করব, যাতে এই মানুষগুলো তাদের নিজের দেশে ফিরে যেতে পারে। তবে ফিরে যাওয়ার জন্য পরিস্থিতি নিরাপদ হতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তা নিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ এখানে তাদের সাদর আমন্ত্রণ থাকবে।'
এমআই