আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ প্রবাল কলোনির সন্ধান পেয়েছেন এক মা ও মেয়ে। এই কলোনিটি লম্বায় প্রায় ১১১ মিটার (৩৬৪ ফুট), যা একটি ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্যের সমান।
মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা 'সিটিজেনস অফ দ্য রিফ' জানায়, প্রবাল কলোনিটি প্রায় ৩,৯৭৩ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। সংস্থাটির মতে, এটি গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে রেকর্ডকৃত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো এবং নথিবদ্ধ ও মানচিত্রভুক্ত হওয়া বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল কলোনি।
গত বছরের শেষের দিকে এই প্রবাল কলোনিটি খুঁজে পান 'সিটিজেনস অফ দ্য রিফ'-এর মেরিন অপারেশন কো-অর্ডিনেটর সোফি কালকোভস্কি-পোপ এবং তার মা জ্যান পোপ। জ্যান পোপ একজন অভিজ্ঞ ডুবুরি ও আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার। জ্যান এর আগের সপ্তাহেও ওই স্থানে ডাইভিং করেছিলেন এবং তার মনে হয়েছিল তিনি বিশেষ কিছু দেখেছেন। এরপরই মা ও মেয়ে মিলে পরিমাপের যন্ত্রপাতি নিয়ে পুনরায় সেখানে ফিরে যান।
অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে সোফি কালকোভস্কি-পোপ বলেন, "যখন আমরা পানিতে নামলাম, তখনই বুঝতে পারলাম আমরা কত গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেখছি।" তিনি প্রবালটির এক পাশ থেকে অন্য পাশ পর্যন্ত সাঁতার কাটার একটি ভিডিও ধারণ করেন। সোফি জানান, "জে-আকৃতির ওই প্রবালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে আমার ভিডিওতেই প্রায় তিন মিনিট সময় লেগেছে।"
'পাভোনা ক্লাভাস' প্রজাতির এই প্রবালের আকার, পানি ও উপরিভাগের উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবি ব্যবহার করে নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব তথ্য দিয়ে একটি 'থ্রিডি মডেল' তৈরি করা হয়েছে। কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির সেন্টার ফর রোবটিক্সের রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার সেরেনা মোউ বলেন, "এই স্থানটি পর্যবেক্ষণ করতে এই ধরনের মডেলিং খুবই কার্যকর। এর মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যতে এসে সরাসরি তুলনা করতে পারব যে সময়ের সঙ্গে প্রবালটিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে।"
বিজ্ঞানীরা এখন খতিয়ে দেখছেন কেন এই স্থানেই প্রবালটি এত বিশাল আকারে বেড়ে উঠল। ধারণা করা হচ্ছে, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের অন্য অনেক অংশের তুলনায় এখানে ঘূর্ণিঝড়ের ঢেউয়ের ঝাপটা কম এবং জোয়ারের তীব্র স্রোত প্রবালটির অস্তিত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রবালটির সঠিক অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ হলো পৃথিবীর বৃহত্তম জীবন্ত কাঠামো এবং অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এখানে ব্যাপক হারে 'কোরাল ব্লিচিং' বা প্রবাল বিবর্ণ হওয়ার ঘটনা ঘটছে। উজ্জ্বল রঙের প্রবালগুলো সাদা হয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ছে। ২০২৩ সাল থেকে রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর একই ভাগ্য বরণ করছে।
'সিটিজেনস অফ দ্য রিফ' মূলত প্রবাল প্রাচীর রক্ষার একটি বৃহৎ উদ্যোগ। মা ও মেয়ের এই দলটি 'গ্রেট রিফ সেন্সাস'-এর অংশ হিসেবে পারিবারিক নৌকা থেকে জরিপ চালাচ্ছিলেন। ইউনির্ভাসিটি অফ কুইন্সল্যান্ডের মেরিন স্পেশাল ইকোলজি ল্যাবের পিট মাম্বি বলেন, "এই জরিপ আমাদের প্রবাল পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলো খুঁজে পেতে সাহায্য করে।"
ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ ডার্বির মলিকুলার ইকোলজির অধ্যাপক মাইকেল সুইট সিএনএন-কে বলেন, "এই কলোনিটি আমি ব্যক্তিগতভাবে এ পর্যন্ত দেখা যেকোনো প্রবালের চেয়ে বড়।"
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বিশেষ দিক হলো—এমন একটি সময়ে যখন অনেক প্রবাল রোগ, বিবর্ণ হওয়া, দূষণ ও ধ্বংসের কারণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, সেখানে এই পাভোনা কলোনি সব প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে। এটি কেবল টিকে নেই, বরং রীতিমতো বিকশিত হচ্ছে।"
সাধারণ নাগরিক বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে এটি খুঁজে পাওয়ার বিষয়টিকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তিনি মনে করেন, এটি প্রমাণ করে যে পৃথিবী রক্ষা এবং নজরদারিতে প্রতিটি মানুষই ভূমিকা রাখতে পারে।
এমআই