স্বাধীনতা দিবস আমাদের সাহস, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস দেয়। পতাকা শুধু কাপড় নয়; এটি আমাদের গর্ব, আমাদের ইতিহাস ও সংগ্রামের নিদর্শন। এই দিন স্মরণ করায় যে সত্যিকারের স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রপ্রাপ্তি নয়, বরং ন্যায়, মর্যাদা এবং নিজের চিন্তা ও বাকস্বাধীনতার অধিকার। দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ ছাড়া স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না। তাই স্বাধীনতা দিবস শেখায়—ভালোবাসা, ত্যাগ এবং অটল সংকল্পের মাধ্যমে আমরা নিজেদের পরিচয় রক্ষা করতে পারি, এবং একসাথে দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে পারি।স্বাধীনতা দিবস নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন....
তানজিল কাজী।
স্বাধীনতা মানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহসস্বাধীনতা দিবস একটি ঐতিহাসিক প্রেরণা ও প্রত্যয়ের দিন। স্বাধীনতার ইতিহাস মূলত দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক দমনের বিরুদ্ধে একটি জাতির সংগঠিত প্রতিরোধের ফল। ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ বিভাজনের মাধ্যমে পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়—পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। সেই সঙ্গে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ বৈষম্যের নতুন অধ্যায়। জাতির মধ্যে নিজস্ব সত্তার প্রতিষ্ঠার চেতনা জাগ্রত হতে থাকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে জনগণের ঐক্য ও প্রতিরোধ সামরিক শাসনের ভিত নড়িয়ে দেয়, যা বাঙালির আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে পাঠ করেন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ তার বহুল প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। স্বাধীনতা মানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সেই সাহস, যার প্রতিধ্বনি শোনা যায় কাজী নজরুল ইসলামের
‘বিদ্রোহী’ কবিতায়—
“মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত,
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।”
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়েও বর্তমান বাংলাদেশের দৃশ্যপট দেখলে মনে হয়, কোথাও যেন স্বকীয়তা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। বিভীষিকাময় মনুষ্যত্বহীনতা এ দেশের সমাজব্যবস্থায় বাসা বেঁধেছে। প্রকৃত দেশপ্রেমিকেরা রাস্তায় গুলি খেয়ে মারা যাচ্ছে। এ দেশে ধর্ষকেরা যেন তাদের নিজস্ব স্বাধীনতা পেয়ে গেছে, আর ধর্ষিতারা বিচারের আশায় পথ চেয়ে বসে থাকে। বাকস্বাধীনতার মেরুদণ্ড যখন ভেঙে যায়, তখন তা আইনের শাসনের ব্যর্থতার এক খণ্ডচিত্র হয়ে ওঠে। শাসনের মসনদে যারা বসে, তারাই অনেক সময় নিজেদের নীতিমালা ভুলে যায়। প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি গুজব ও বিভ্রান্তিও সমাজে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। তবে সচেতন তরুণ প্রজন্মের উদ্যোগ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ভবিষ্যতের জন্য এখনো আশার আলো জাগিয়ে রাখে।
লিমা আক্তার
শিক্ষার্থী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সংগ্রামের পথ বেয়ে স্বাধীনতার ঠিকানায়বন্দিত্ব সবসময় দৃশ্যমান শিকলে বাঁধা থাকে না; কখনো তা নেমে আসে ভাষার ওপর চাপিয়ে দেওয়া নীরবতায়, কখনো অধিকারহীন মানুষের দীর্ঘশ্বাসে। বাঙালির ইতিহাস সেই অদৃশ্য বন্দিত্ব ভেঙে জেগে ওঠার এক অনন্য আখ্যান।
একসময় বাঙালি জাতি নীরবে অনেক কিছু সহ্য করেছে। কিন্তু বুকের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ একসময় শব্দ হয়ে উচ্চারিত হয়েছে প্রতিবাদে। শুরুটা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে, এরপর ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। রাজপথে নামা তরুণদের চোখে ছিল সাহস, কণ্ঠে ছিল অদম্য প্রত্যয়—“আমাদের কথা আমরা বলব।” সময়ের পরিক্রমায় সেই কণ্ঠস্বর আর থেমে থাকেনি; তা বজ্রধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামে, মানুষের হৃদয় থেকে মাটির গভীরে। বন্দিত্ব তখন আর কেবল শাসকের নির্মিত প্রাচীর নয়, বরং তা হয়ে ওঠে ভেঙে ফেলার সংকল্প।
১৯৭১ সালে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন বাঙালি বুঝে যায়—স্বাধীনতা কাউকে উপহার দেওয়া হয় না, তা সংগ্রাম করে ছিনিয়ে নিতে হয়। অন্ধকারের গভীরতা পেরিয়েই বাঙালি খুঁজে নেয় মুক্তির আলো। রক্ত, অশ্রু ও অসংখ্য ত্যাগের বিনিময়ে জন্ম নেয় এক নতুন সকাল—একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি স্বাধীন পতাকা, একটি স্বাধীন পরিচয়। সেই নাম—বাংলাদেশ।
নাবিলা তাবাসসুম সিনথিয়া
শিক্ষার্থী, ঢাকা সিটি কলেজ
মুক্তির ডাক থেকে স্বাধীনতার বর্তমান অবস্থান১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ। “মুক্তির ডাক” ছিল বাঙালির অধিকার, সম্মান ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান—একটি এমন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে, ন্যায়বিচার পাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারবে।
কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি? স্বাধীনতার বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা অগ্রগতি অর্জন করেছি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষার বিস্তার এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ আজ একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।
তবে এর পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ কি আসলেই স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়। সমাজের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে লড়াই করছে।
স্বাধীনতা শুধু ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের চিন্তা, মত প্রকাশ, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যদি একজন সাধারণ নাগরিক তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, যদি সে ভয় বা অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে, তবে সেই স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না। তাই বলা যায়, আমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।
মুজাহিদ আল রিফাত
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
পতাকার মাঝে একটি জাতির আত্মপরিচয়“একটি পতাকা মানে একটি দেশ, লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে”—এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের স্বাধীনতার গৌরবময় ইতিহাস, ত্যাগ আর সংগ্রামের অমর কাহিনি।পতাকা শুধু কাপড়ের তৈরি একটি টুকরো নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক, আমাদের অহংকার। লাল-সবুজের এই রঙের মাঝে আছে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাস। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটারের একটি স্বাধীন দেশ—আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এই ভূখণ্ড আমাদের অর্জন, আমাদের গর্ব, আমাদের অস্তিত্বের ঠিকানা।
এই পতাকা কখনোই আমাদের মাথার ওপর উড়ত না, যদি না শহীদেরা তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে তা সম্ভব করে তুলতেন। শহিদেরা প্রমাণ করে গেছেন, দেশের প্রতি ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁরা তাঁদের স্বপ্ন, পরিবার, সবকিছু ছেড়ে দিয়েছেন এই দেশের জন্য।
তাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, যেন আমরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারি, কথা বলতে পারি, নিজের পরিচয়ে গর্ব করতে পারি। তাঁদের সেই ত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশপ্রেম শুধু একটি অনুভূতি নয়; এটি দায়িত্ব, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
তাসনিম আক্তার কনা
শিক্ষার্থী, ঢাকা সিটি কলেজ
সময় জার্নাল/একে