লাবনী আক্তার কবিতা:
তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বদলে গেছে অনেক কিছু। আগে যেমন কারো সাথে যোগাযোগ করার জন্য একটি চিঠি পাঠিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো আর এখন তা হয়ে যায় কয়েক সেকেন্ডে। এই উন্নয়নের ছোয়া লেগেছে লাইব্রেরীতেও। আগে কোনো বই পড়তে হলে লাইব্রেরী গিয়ে খুঁজতে হতো অথবা নিজের কিনে নিতে হতো এখন আর তার প্রয়োজন পরে না। মুঠোফোনেই গড়ে উঠেছে ভার্চুয়াল লাইব্রেরী। হাজারোধিক বই এখানে রাখা যায় খুব সহজেই।
সবকিছুর উপকার থাকলে অপকারও থাকে। এই ভার্চুয়াল লাইব্রেরী আমাদের কতোটা উপকারে আসছে আর কতোটা ক্ষতি করছে তা যেন এক বিরাট প্রশ্ন। মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালাতে কোনটা বেশি ভূমিকা রাখছে ভার্চুয়াল লাইব্রেরী নাকি প্রিন্টেড বই?
ভার্চুয়াল লাইব্রেরি হলো এমন একটি অনলাইন তথ্যভান্ডার, যেখানে বিভিন্ন ধরনের বই, প্রবন্ধ, গবেষণাপত্র ইন্টারনেটের মাধ্যমে পড়া বা ডাউনলোড করা যায়। মূলত বইগুলো সফট কপি এখানে পাওয়া যায়।এতে ব্যবহারকারীরা যেকোনো সময়, যেকোনো প্রান্ত থেকে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে বই পড়তে পারে। এখানে বই সংরক্ষিত রাখার জন্য বড় কোনো বুকশেলফ বা আলাদা রুমের প্রয়োজন পড়ে না বরং একটি সার্ভারেই হাজার হাজার বই থাকে। এখানে বই পড়ার জন্য অপেক্ষা বা এক বই নিয়ে কারো মধ্যে টানাটানি করা লাগে না বরং এক বই চাইলে একসাথে সবাই পড়তে পারে নিজস্ব ডিভাইস থেকে। এই অনলাইন কপি সহজে নষ্ট হয় না, তবে ডেটা মাইগ্রেশন এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ থাকে।তবে এক্ষেত্রে ডেটা ব্যাকআপ রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ। এইসব বইয়ে নিজের ইচ্ছেমত ফন্টের আকার পরিবর্তন, সার্চ অপশন, টেক্সট-টু-স্পিচ, হাইলাইটিং করা যায় ফলে নোট করা অনেক সহজ হয়।এইসব বই ব্যবহারে কাগজ ও কালির প্রয়োজন হয় না, ফলে গাছ কাটা অনেক কমে যায়, যা ভীষণ পরিবেশবান্ধব।
সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাগুলো হলো: ডিজিটাল স্ক্রিনে বই পড়লে পাঠকের সাথে বইয়ের সংযোগ কম থাকে। বই ধরার অনুভূতি বা গন্ধের অভাবে পাঠকের আবেগ কম থাকে। কিছু কিছু বই ডাউনলোড করা গেলেও বেশিরভাগ বই ডাউনলোড করা যায় না তাই কখনো ইন্টারনেট না থাকলে বই পড়া কঠিন হয়ে যায়। ভার্চুয়াল লাইব্রেরীতে বই পড়ার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের শরীর। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে বই পড়লে চোখের ওপর চাপ পড়তে পারে, ঘাড় বা মাথা ব্যথা সৃষ্টি হয়, এছাড়া ফোনের রেডিয়েশনও শরীরের ক্ষতি করে।
প্রিন্টেড বই হলো এমন এক ধরনের বই যা কাগজে মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয় এবং এতে মলাট, পৃষ্ঠা ও ছাপা লেখা থাকে, যা পড়তে কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। সাধারন বইয়ের হার্ড কপি বলতে যা বোঝায়। প্রিন্টেড বই পড়ার মাধ্যমে পাঠকের সাথে বইয়ের মানসিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বইয়ের গন্ধ যেন পাঠকের কাছে এক আবেগ হিসেবে কাজ করে।
বইয়ের পাতা উল্টানো আমাদের মস্তিষ্কে একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা এবং ভালো অনুভূতি দেয়। স্ক্রিনে বই পড়ার চেয়ে প্রিন্টেড বই সাধারণত চোখের জন্য বেশি আরামদায়ক। প্রিন্টেড বই পড়ার সময় নোটিফিকেশন বা ইন্টারনেট-জনিত কোনো সমস্যা নেই ফলে মনোযোগের ব্যাঘাত কম হয়।
তবে এতো আবেগ আর সুবিধা মাঝেও প্রিন্টেড বইয়ের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বইগুলোর দাম বেশি হয়ে থাকে আবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বহন করা কঠিন। এসব বই রাখার জন্য বিশাল জায়গা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয় ফলে খরচ বেশি হয়। বইয়ের পাতা সময়ের সাথে সাথে নষ্ট হতে পারে, অথবা পোকামাকড় বা আর্দ্রতার কারণে ক্ষতি হতে পারে। প্রিন্টেড বই তৈরীতে অনেক কাগল ও কালি সহ বিভিন্ন উপকরণ লাগে যা সার্বিকভাবে পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ভার্চুয়াল লাইব্রেরী অথবা প্রিটেন্ড বই দুটোই আমাদের জন্য কিছু উপকার এবং অপকার বয়ে আনে। কিন্তু প্রশ্ন যখন উঠে কে সেরা, তখন আমাদের এ কথা মাথায় রাখা উচিত যে আগে যখন ভার্চুয়াল লাইব্রেরী ছিলো না, বই কিনে অথবা লাইব্রেরীতে গিয়ে পড়তে হতো তখন পাঠকের সংখ্যা বেশি ছিলো আর সাহিত্য রুচিও ছিলো অসাধারণ। কিন্তু এখন ডিজিটাল যুগে এসে হাজার হাজার বই যখন সকলের হাতের মুঠোয় তখন মানুষ হয়ে যাচ্ছে বই বিমুখ, পাঠকের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
লেখক: লাবনী আক্তার কবিতা
লোকপ্রশাসন বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।