মুহা: জিললুর রহমান সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরা জেলায় পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্তে¡ও পেট্রোল ও অকটেনের সংকট কাটছে না। অভিযোগ উঠেছে, এক শ্রেণির ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকরা পাম্প থেকে তেল নিয়ে তা বাইরে উচ্চ দামে বিক্রি করছেন। ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে প্রতি একদিন অন্তর নিয়মিত তেলের সরবরাহ থাকলেও একটি চক্র একাধিক পাম্প থেকে প্রতিদিন তেল সংগ্রহ করছে। তারা পাম্প থেকে স্বাভাবিক দামে তেল কিনে বাইরে প্রায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। বিশেষ করে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকদের একটি বড় অংশ এ কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে কিছু প্রাইভেটকার চালকরাও এই অবৈধ ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। তারা পাম্প থেকে গাড়ির ট্যাঙ্কিতে তেল ভরে নিয়ে বাইরে গিয়ে ড্রামে অথবা বোতলে ভরে ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করছে। কোথাও আবার এই তেল ৩০০ টাকা লিটারও বিক্রি হচ্ছে। যে সকল গ্রাহকরা লাইনে দাড়িয়ে তেল নিতে পারছেন না তারা বাধ্য হয়ে অধিক দামে তেল কিনছেন।
সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৫ হাজারের অধিক ভাড়ায় চালিত মটরসাইকেল রয়েছে। এই চালকদের একটি বড় অংশ এখন যাত্রী পরিবহনের পরিবর্তে
পাম্প থেকে তেল নিয়ে বাইরে উচ্চ দামে বিক্রির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। পাম্প থেকে তেল সরবরাহের খবর পেয়ে তারা মটরসাইকেল নিয়ে আগের দিন সন্ধ্যার আগে সংশ্লিষ্ট পাম্পে লাইন দিচ্ছে। পরদিন বেলা বাড়ার সাথে সাথে এই লাইন আরো দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির মানুষ ও সাধারণ গ্রাহকরা পরে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। ফলে কর্মজীবী মানুষ ও জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। অনেকেই অভিযোগ করেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও পাম্প থেকে তেল পাচ্ছেন না। এচিত্র জেলার প্রায় প্রতিটি তেল পাম্পে।
আশাশুনির বড়দল এলাকার সন্তোষ কুমার মন্ডল বলেন, পেট্রোল পাম্প থেকে বাড়ি অনেক দূরে হওয়ায় সকালে এসে সিরিয়ালে দাড়িয়েও অনেক সময় তেলা পাওয়া যাচ্ছে না। ভাড়ায় চালিত মটরসাইকেল চালকদের কারণে তারা সহজে কাছাকাছি সিরিয়িাল পান না। ফলে বাধ্য হয়ে সোমবার (৬ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ঝাউডাঙ্গা এলাকার একজন
ভাড়ায় চালিত মটরসাইকেল চালকের কাছ থেকে ২২০ টাকা দরে ৫লিটার পেট্রোল কিনেছি। স্থানীয় বড়দল বাজারে এই তেল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা লিটার।
সাতক্ষীরা শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ি ও সাংবাদিক আব্দুস সামাদ বলেন, কয়েকদিন আগে তিনি একটি প্রাইভেট কার ভাড়া নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে খুলনায় গিয়েছিলেন। গাড়ির চালক শহরের লস্করের পাম্প থেকে তেল নিয়ে কিছু দূর গিয়ে সেই তেলের একটি অংশ ড্রামে ভরে আমাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে বাইরে রেখে আসেন। খুলনা থেকে ফেরার পথে আরো একটি পাম্প থেকে তেল নিয়ে একই কায়দায় তিনি তা ড্রামে ভরে ফেলেন। চলার পথে তার মোবাইলে বার বার তেলের জন্য ফোন আসছিল। মোবাইলে চালকের কথপোকথনে মনে হয়েছে সে পাম্প থেকে গাড়িতে তলে নিয়ে বাইরে বিক্রি ব্যবসার সাথে জড়িত।
এদিকে জনৈক মোঃ হাবিবুল্লাহ বাহার হাবিব জেলার পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে চোরাপথে খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা অনুযায়ি জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। যথেষ্ট মজুদ আছে বলে আছে বলে জানা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পেট্রোল পাম্পের জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে চোরাপথে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এই সিন্ডিকেট ব্যবসায় যোগসূত্র রয়েছে তেল পাম্প কতৃপক্ষের।
ফলে পেট্রোল পাম্পে তেল পাওয়া না গেলেও খোলাবাজারে উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের সামনে জ্বালানি তেল ক্রয়ে আগ্রহীদের প্রচন্ড ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। তেল পাম্পে জ্বালানি সরবরাহের একদিন আগে শত শত গাড়ি সারিবদ্ধভাবে রাখা দৃশ্যমান। ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল সহ অনেক অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন তেল পাম্পে থেকে বারবার তেল নিয়ে মজুদ করছে। ফলে বিপাকে পড়ছে বিভিন্ন ব্যবসায়ি, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবি ও পেশাদার সাংবাদিকরা।
তিনি দাবি জানিয়ে আরো বলেন, সাতক্ষীরার সকল তেল পাম্পে একই দিনে একটি নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হলে দীর্ঘ লাইন দেওয়া কমে যাবে এবং
ভোগান্তি কমবে জনসাধারণের। একই সাথে প্রশাসনিক মনিটরিং জোরদার করা ও অসাধু ব্যবসায়িদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে এই সিন্ডিকেট ব্যবসা।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের নজরদারির অভাব ও পাম্প কর্তৃপক্ষের শিথিলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি তেল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্বেও এই সংকট সহাজে কাটবে না বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সাধারণ গ্রাহকদের দাবি, তেল বিক্রিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, একাধিকবার তেল উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকট নিরসন করা হোক। অন্যথায় পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকটের এই চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়বে।
এমআই