তানসেন রৌবায়েত সরকার:
কোনো জাতির ভাগ্য নির্ধারণে সেই অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোনো জাতির উত্থান বা পতন কেবল তাদের বীরত্বের ওপর নয়, বরং সেই অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ এবং জলবায়ুর ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে। যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘Geographical Determinism’ বা ভৌগোলিক নিয়তিবাদ। ঐতিহাসিক আরনল্ড টয়েনবি তার ‘A Study of History’ গ্রন্থে একটি অমর তত্ত্ব দিয়েছেন—‘Challenge and Response’। তার মতে, যে জাতি যত বেশি প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তারা তত বেশি উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হয়।
ইউরোপের দিকে তাকালে আমরা দেখি এক রুক্ষ, শীতল ও পাথুরে ভূখণ্ড। সেখানে বছরের অর্ধেক সময় বরফে ঢাকা থাকে, চাষাবাদ অত্যন্ত সীমিত এবং জীবন ধারণের জন্য প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করতে হয়। এই প্রতিকূলতাই ইউরোপীয়দের মধ্যে 'অনুসন্ধিৎসু' মানসিকতা তৈরি করেছিল। l ১৪৯২ সালে কলম্বাস যখন আটলান্টিক পাড়ি দিলেন কিংবা ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা যখন উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে কালিকট বন্দরে পৌঁছালেন, তাদের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘বাণিজ্য এবং জীবিকা’।
অন্যদিকে,সে সময়কার ভারতের সমৃদ্ধি ছিল কিংবদন্তীতুল্য। মুঘল সম্রাটদের আমলে ভারতবর্ষের জিডিপি ছিল পৃথিবীর মোট জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ। এদেশের মসলিন, রেশম আর কৃষিজাত পণ্য সারা বিশ্বকে মোহিত করে রাখত। আর আমাদের এই সুজলা-সুফলা বাংলা ছিল প্রকৃতির এক অকৃপণ দান। এখানকার মাটি এতই উর্বর যে, কোনো যত্ন ছাড়াই আম-কাঁঠালের আঁটি থেকে মহীরুহ জন্ম নেয়। নদীর পলিমাটি আমাদের দিয়ে এসেছিল অফুরন্ত শস্য। নদীমাতৃক এই বাংলায় জালের এক খেওয়ায় পাওয়া যেত প্রচুর মাছ। যখন মানুষের পেটের চিন্তা থাকে না, তখন তার মধ্যে অজানাকে জানার বা নতুন কিছু উদ্ভাবন করার তাড়না কমে আসে। আরনল্ড টয়েনবি তার ‘এ স্টাডি অব হিস্ট্রি’ গ্রন্থে বলেছিলেন, "অতিরিক্ত সহজ জীবন সভ্যতাকে স্থবির করে দেয়।" বাংলার মানুষের জন্য জীবন ছিল অত্যন্ত সহজলভ্য।
আমার নিজের গ্রামের দিকে তাকালে এই দর্শনের এক জীবন্ত প্রতিফলন দেখতে পাই। আমার গ্রামের এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সারা জীবনে একবারও ঢাকা শহরে পা রাখেননি। কেন আসেননি? তার উত্তর খুব সহজ—তাদের যা প্রয়োজন, তার সবটুকুই গ্রাম তাদের দিয়ে দিচ্ছে। নিজের গোলার ধান, পুকুরের মাছ আর আঙিনার শাকসবজিতে যখন পেট ভরে যায়, তখন অজানাকে জানার বা নতুন কোনো শহরে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। এই যে ‘স্বস্তির বলয়’ বা Comfort Zone, এটাই আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের হাজার বছরের মনস্তত্ত্ব। আমরা আমাদের উর্বর জমিতেই সন্তুষ্ট ছিলাম, আর ওদিকে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অভাবের তাড়নায় মানুষ সমুদ্র জয়ের নেশায় মেতেছিল।
প্রাচুর্যের কারণে এই অঞ্চলের মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে ছিল না, তবে সেই জ্ঞানের ধরণ ছিল ভিন্ন। এদেশের মানুষ মগ্ন ছিল দর্শন, সাহিত্য, আধ্যাত্মিকতা এবং ধর্মীয় চর্চায়। আমাদের চিন্তা ছিল অন্তর্মুখী। অন্যদিকে ইউরোপীয়রা তাদের মেধাকে কাজে লাগিয়েছিল বহির্মুখী কাজে—যেমন কম্পাস তৈরি, মানচিত্র অঙ্কন, উন্নত কামান ও যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন। যখন ইউরোপীয় শক্তিগুলো সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এদেশের উপকূলে পৌঁছাল, তখন তারা ছিল উন্নত প্রযুক্তিতে সজ্জিত এক একটি সুসংগঠিত বাহিনী। আর আমরা তখন গৃহবিবাদ এবং আত্মতুষ্টিতে মগ্ন। ইংরেজরা যখন এদেশে আসে, তারা অবাক হয়ে দেখেছিল যে এখানকার সাধারণ কৃষক বা মানুষ বিশ্বরাজনীতি বা সমুদ্রপথ নিয়ে কোনো খবরই রাখে না, কারণ তাদের জীবন কাটে তাদের গ্রামকে কেন্দ্র করে।
ইংরেজরা এদেশের মানুষকে শাসন করার জন্য সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা চালিয়েছিল । ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা প্রায়ই বলতেন, "বাংলার মাটি যতটা উর্বর, তার সন্তানরা ততটাই মোলায়েম।" তাদের ঐতিহাসিক ও নৃবিজ্ঞানীদের বর্ণনায় এ দেশের মানুষকে প্রায়ই ‘শান্ত ও অলস’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তারা লক্ষ্য করেছিল, এখানকার মনোরম আবহাওয়া এবং খাবারের সহজলভ্যতা মানুষের লড়াকু মানসিকতাকে শিথিল করে দিয়েছে। লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি বা ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যেন এ দেশের মানুষ কেবল কেরানি বা অনুগত প্রজা হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা বুঝেছিল, যাদের পেটের ক্ষুধা নেই, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে হারানো সহজ যদি তাদের মানসিকভাবে পরাধীন করে রাখা যায়। ইংরেজরা যখন উন্নত অস্ত্রশস্ত্র এবং সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এদেশে এল, তখন আমাদের নবাব বা রাজারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ ভোগবিলাস আর গৃহবিবাদে মগ্ন ছিলেন। অভাব যাদের ছিল না, তারা ষড়যন্ত্রের শিকার হলো; আর অভাব যাদের নিত্যসঙ্গী ছিল, তারা বুদ্ধির জোরে পুরো এক উপমহাদেশ শাসন করে নিল।
ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের ধনবান করেছে ঠিকই, কিন্তু মানসিকতাকে করেছে গণ্ডিবদ্ধ। ইউরোপীয়রা তাদের প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে বিশ্ব শাসন করেছে, আর আমরা আমাদের অনুকূল পরিবেশের মোহে পড়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছি। ইতিহাস থেকে আমাদের শেখা উচিত যে, কেবল সম্পদ থাকলেই হয় না, সেই সম্পদ ধরে রাখার জন্য এবং আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ক্রমাগত অজানাকে জানার নেশা থাকতে হয়। পেট ভরে গেলে যে আর অন্য কিছু দরকার নেই—এই মানসিকতাই আমাদের পতনের মূল কারণ। আজকের পৃথিবীতেও যদি আমরা কেবল নিজেদের গণ্ডির ভেতর সীমাবদ্ধ থাকি, তবে ইতিহাস আবার অন্য কোনো রূপে নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে।
ইমতিয়াজ/একে