আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
আলোচনা হবে কি হবে না? শান্তি আসবে, নাকি যুদ্ধই চলবে? এ মুহূর্তে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সঙ্গে চলমান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ার সংঘাগে ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর বেশিরভাগই বেসামরিক ও শিশু। প্রায় ৬০০০ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। যুদ্ধবিরতি শেষ হতে আর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মতো বাকি।
দ্বিতীয় দফার আলোচনা ইসলামাবাদে নির্ধারিত হয়েছে। তবে ইরান এখনো অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি। একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হলো- যুদ্ধবিরতি শেষ হলে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই খবর এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার আরেকটি প্রচেষ্টায় ইসলামাবাদে যাচ্ছেন (বা ইতিমধ্যে রওনা হয়েছেন। এমনটাই জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিশ্বের জন্য এই মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত ১০ দিন আগের তুলনায় আরও বেশি, যখন যুদ্ধবিরতি নিয়ে কিছুটা আশাবাদ ছিল। কিন্তু এরপর উভয় পক্ষের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কারণে তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বেড়েছে।
৪১ বছর বয়সী জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে আগের বৈঠকে অনেক আশা করা হয়েছিল, বিশেষ করে ইরান তাকে তুলনামূলকভাবে ‘যুদ্ধবিরোধী মধ্যপন্থী’ হিসেবে দেখেছিল বলে জানা যায়। ভ্যান্সকে অনেকেই ট্রাম্পের ‘ব্যাড কপ’-এর বিপরীতে ‘গুড কপ’ হিসেবে দেখতেন। তিনি যুক্তিসঙ্গত কণ্ঠ হিসেবে উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারেন। কারণ ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ইরানকে ‘পাগল’ বলে আখ্যা দেয়া থেকে শুরু করে তাদের সভ্যতা ধ্বংসের হুমকিও দিয়েছিলেন।
কিন্তু আলোচনার ফল ভালো হয়নি। ২১ ঘণ্টার উত্তেজনাপূর্ণ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা বেশিরভাগ সময় আলাদা কক্ষে ছিলেন। আর পাকিস্তান ও ওমানের কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। ফলাফল- কোনো চুক্তি হয়নি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা, কিংবা তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল করা। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনোও চুক্তি হয়নি। বৈঠক শেষে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত বা বন্ধ করার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট অঙ্গীকার দেয়নি।
চুক্তি না হলে কি ভ্যান্সের অবস্থান ঝুঁকিতে?
ডনাল্ড ট্রাম্প সাধারণত তার সহকারীদের ব্যর্থতা সহজভাবে নেন না। তাই আগের ব্যর্থতার জন্য ভ্যান্সের অবস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারত- যদিও প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে এবারও যদি কোনো চুক্তি না হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্প দ্রুত ৬০ দিনের সেই সীমার দিকে এগোচ্ছেন, যার পর তাকে সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। ভ্যান্সের জন্য এই আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ভাবা হচ্ছে।
সম্প্রতি কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সের এক জরিপে তিনি ৫৩ ভাগ ভোট পেয়ে শীর্ষে ছিলেন।
দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি সমর্থন পেয়েছেন শতকরা ৩৫ভাগ। রুবিও যুদ্ধের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন এবং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য জরুরি বলেছেন। অন্যদিকে ভ্যান্স তুলনামূলকভাবে শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জনমতও বদলাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৭ ভাগ আমেরিকান স্থলযুদ্ধে সমর্থন দেন। আর ৬৬ ভাগ দ্রুত যুদ্ধ শেষ চায়। এই প্রেক্ষাপটে, যদি ভ্যান্স শান্তি চুক্তি করতে পারেন, তাহলে তার রাজনৈতিক অবস্থান অনেক শক্তিশালী হবে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে- ইরান আদৌ আলোচনায় বসবে কি না।
সোমবার এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ভাঙতে চাওয়া ইরানি জাহাজ তৌসকা জব্দের ঘটনা এখনো বড় ইস্যু। ট্রাম্প দাবি করেন, সতর্কতা উপেক্ষা করায় মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে আঘাত করে সেটিকে থামায়। এরপর কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তেহরান আলোচনায় অংশগ্রহণ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে বলে খবর এসেছে। তবে এখনো কোনো নিশ্চিত ঘোষণা নেই, আর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
যুদ্ধবিরতি শেষ হবে ২২ এপ্রিল বুধবার। ট্রাম্প বলেছেন এটি নবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম। বরং তিনি সতর্ক করেছেন- চুক্তি না হলে ‘অনেক বোমা’ ফেলা হবে। অর্থাৎ, আরও ভয়াবহ যুদ্ধ ঠেকাতে ইরান ও ভ্যান্সের হাতে সময় খুবই কম- যে যুদ্ধ সরাসরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্থলবাহিনীও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
এমআই