আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরান যুদ্ধে যেসব মিত্র দেশ আমেরিকার পাশে দাঁড়ায়নি, তাদের 'শাস্তি' দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামরিক অবদান ও আনুগত্যের নিরিখে ইতিমধ্যেই একটি 'ভালো ও মন্দ' তালিকা তৈরি করেছে হোয়াইট হাউস।
চলতি মাসেই ওয়াশিংটন সফরে আসার কথা ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটের। তিন ইউরোপীয় কূটনীতিক ও এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, রুটের সফরের আগেই সদস্য দেশগুলোর কার কী ভূমিকা, তার একটি বিস্তারিত খতিয়ান তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দেশগুলোকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা হয়েছে।
মিত্র দেশগুলো কথা না শুনলে ফল ভুগতে হবে বলে যে হুঁশিয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়ে আসছিলেন, এই তালিকা তারই প্রতিফলন। এর আগে গ্রিনল্যান্ড দখল বা ন্যাটো থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার হুমকি দিয়ে জোটের মধ্যে চাপ তৈরি করেছিলেন ট্রাম্প।
ডিসেম্বরেই এই পরিকল্পনার আভাস দিয়েছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি বলেছিলেন, 'ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া, পোল্যান্ড বা জার্মানির মতো যেসব মিত্র রাষ্ট্র আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে, তারা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাবে। কিন্তু যারা যৌথ প্রতিরক্ষায় অংশ নেবে না, তাদের চরম মূল্য চুকাতে হবে।'
ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ গোপন রাখলেও, 'অবাধ্য' দেশগুলোকে ঠিক কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়েতে হতে পারে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলেন, শাস্তি হিসেবে এক দেশ থেকে সেনা সরিয়ে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়ার বিকল্প খোলা আছে ঠিকই, কিন্তু তাতে শেষপর্যন্ত আমেরিকারই ক্ষতি। প্রক্রিয়াটি যেমন ব্যয়বহুল, তেমনই সময়সাপেক্ষ।
মিত্র দেশগুলোর প্রতি অসন্তোষ গোপন রাখেনি হোয়াইট হাউস। মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, 'তথাকথিত বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে আমেরিকা সবসময় সুরক্ষা দিলেও অপারেশন এপিক ফিউরি-র সময় অনেক দেশই পাশে থাকেনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বৈষম্য মেনে নেবেন না। আমেরিকা সব মনে রাখবে।'
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলেও ন্যাটো সাড়া দেয়নি।
তবে ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা সম্পূর্ণ সরিয়ে নেওয়ার বিকল্প কম থাকায় শেষপর্যন্ত এক দেশ থেকে অন্য দেশে সেনা সরিয়েই ট্রাম্প তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবেন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
নেকনজরে পোল্যান্ড-রোমানিয়া, চাপে স্পেন-ব্রিটেন
ট্রাম্প প্রশাসনের এই তালিকায় কোন দেশ ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার নাম যে 'ভালো' দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকে, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। দুই দেশই ট্রাম্পের বিশেষ নেকনজরে রয়েছে এবং সেখানে আরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সামরিক ব্যয়ের নিরিখে পোল্যান্ড এখন ন্যাটো-র প্রথম সারিতে। দেশটিতে মোতায়েন ১০ হাজার মার্কিন সেনার যাবতীয় খরচও পোল্যান্ড সরকারই বহন করে।
অন্যদিকে ইরান যুদ্ধে রোমানিয়ার সম্প্রসারিত মিহাইল কোগালনিচানু বিমানঘাঁটি ব্যবহার করেছে আমেরিকা। ফলে দেশটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে পেন্টাগনের।
ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ৫ শতাংশ সামরিক ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা যারা ছুঁতে পেরেছে, তাদেরই 'আদর্শ বন্ধু' হিসেবে দেখছেন হেগসেথ। জানুয়ারিতে প্রকাশিত আমেরিকার জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে।
পেন্টাগন বলেছে, যারা যৌথ প্রতিরক্ষায় বেশি অবদান রাখবে, তাদেরই সহযোগিতা ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর ফলে 'অবাধ্য' দেশগুলো যৌথ মহড়া বা আধুনিক অস্ত্র কেনা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
ইরান অভিযানের প্রশ্নেও মিত্র দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ মোকাবিলা বা নিজেদের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়ার নিরিখে বন্ধুদের নম্বর দিচ্ছেন ট্রাম্প। ব্রিটেন, ফ্রান্স বা স্পেনের মতো দেশ এই অভিযানে সরাসরি সাহায্য করতে অস্বীকার করলেও রোমানিয়া বা বুলগেরিয়ার মতো ছোট দেশগুলো নীরবে আমেরিকার হাত শক্ত করেছে।
গত বছর হেগ-এর বৈঠকে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় স্পেন আগে থেকেই ট্রাম্পের বিরাগভাজন হয়েছিল। উল্টো দিকে লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া বা এস্তোনিয়ার মতো বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো তাদের জিডিপি-র একটা বড় অংশ সামরিক খাতে খরচ করায় ওয়াশিংটনের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
পেন্টাগনের নীতিনির্ধারক প্রধান এলব্রিজ কোলবি ন্যাটোর সদস্যদের বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিরাপদ রাখতে মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে এগিয়ে আসতেই হবে।
তবে ট্রাম্পের এই কড়া অবস্থান নিয়ে খোদ ক্যাপিটল হিলেই সমালোচনা শুরু হয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকারের মতে, মিত্র দেশগুলোকে এমন তাচ্ছিল্য করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। জোটের কৌশলগত ও নৈতিক গুরুত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের অনুধাবন করা উচিত।
ফিনল্যান্ডের একজন সাবেক কর্মকর্তার মতে, ইরান যুদ্ধে ব্যস্ত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে এই মুহূর্তে ইউরোপের সঙ্গে নতুন কোনও বিবাদ শুরু করার মতো সময় বা শক্তি—কোনোটাই থাকা কঠিন।
এমআই