আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দুই সামরিক বাহিনীর দেশ রাশিয়া ও ভারত তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যার মাধ্যমে তারা একে অপরের ভূখণ্ডে সেনা ও সামরিক বিমান মোতায়েন করতে পারবে।
'রিসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিকস সাপোর্ট' (আরইএলওএস) নামে দ্বিপাক্ষিক এই চুক্তিটি গত বছর স্বাক্ষরিত হয় এবং বর্তমানে কার্যকর। এই চুক্তির মাধ্যমে শান্তিকাল ও যুদ্ধকাল—উভয় সময়েই দুই দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটি, নৌবন্দর এবং বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে।
বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতিনির্ধারণও নয়াদিল্লি ও মস্কোর লাখো মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে।
আরইএলওএস চুক্তিতে কী রয়েছে?
গত আট বছর ধরে আলোচনা শেষে চুক্তিটি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মস্কোতে স্বাক্ষরিত হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত ১৫ ডিসেম্বর ফেডারেল আইনের মাধ্যমে এর অনুমোদন দেন।
গত ১২ জানুয়ারি থেকে চুক্তিটি কার্যকর হলেও এর বিস্তারিত তথ্য রুশ কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে প্রকাশ করেছেন।
চুক্তিটি প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে তা বাড়ানো যাবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই চুক্তির আওতায় উভয় দেশ একে অপরের ভূখণ্ডে তিন হাজার সেনা, পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০টি সামরিক বিমান মোতায়েন করতে পারবে।
ক্রেমলিন এক বিবৃতিতে জানায়, 'এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো সামরিক বাহিনীর মোতায়েন, যুদ্ধজাহাজের বন্দর ভ্রমণ এবং সামরিক বিমানের আকাশসীমা ও বিমানঘাঁটি ব্যবহারের পদ্ধতি নির্ধারণ করা।'
এই লজিস্টিক সহায়তা চুক্তি জ্বালানি সরবরাহ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন সেবা কাঠামো নির্ধারণ করে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের বিদ্যমান রুশ সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণকে সহজ করবে।
এছাড়া নৌবাহিনীর জন্য খাদ্য, পানি ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত। বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এতে এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, নেভিগেশন সহায়তা, নিরাপত্তা, জ্বালানি, লুব্রিকেন্ট এবং রক্ষণাবেক্ষণ সেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তিটি দুই দেশের সামরিক বাহিনীর যৌথ প্রশিক্ষণ এবং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রমও সহজ করবে।
রাশিয়ার জন্য এর সুবিধা কী?
শীতল যুদ্ধের সময় থেকে প্রতিরক্ষা খাত রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের মূল ভিত্তি। ১৯৬০-এর দশক থেকে মস্কো ভারতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী।
২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া সস্তায় তেল বিক্রি শুরু করলে ভারত তার অন্যতম বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমালোচনার মুখে পড়ে নয়াদিল্লি।
এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া প্রথমবারের মতো ভারত মহাসাগরে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশাধিকার পাবে। পাশাপাশি ভারত রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তক থেকে মুরমানস্ক পর্যন্ত উত্তর সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্নের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দেবে।
চুক্তিটি রাশিয়াকে ভারত মহাসাগরে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে এবং তার প্রভাব বিস্তার করতে সহায়তা করবে।
ভারতের জন্য এর সুবিধা কী?
ভারতের জন্য এই চুক্তি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটি শুধু অস্ত্র কেনাবেচার সম্পর্ক নয়, বরং কার্যকর সামরিক সহযোগিতায় রূপ নিয়েছে।
ভারত রাশিয়ার আর্কটিক ও দূরপ্রাচ্যের সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যবহার করতে পারবে, যা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এটি পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প পথ তৈরি করে এবং চীনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করে।
ভারত কি তাহলে রাশিয়া থেকে সরে আসছে না?
ভারত ঐতিহাসিকভাবেই সামরিক সরঞ্জামের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
যদিও মার্কিন চাপে ভারত তার প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে, তবুও রাশিয়ার সাথে এই চুক্তি ভারতের 'মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট' বা বহুমুখী জোটনীতিরই অংশ।
জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমিতাভ সিংয়ের মতে, ভারত রাশিয়ার সাথে কেবল অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ না থেকে কৌশলগত বিষয়েও সক্রিয় অংশগ্রহণ বজায় রাখতে চায়।
মার্কিন প্রভাব ও ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন
যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও ভারতের 'এলইএমওএ' লজিস্টিক চুক্তি রয়েছে। তবে রাশিয়ার সাথে এই চুক্তির বড় পার্থক্য হলো—সৈন্য ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সুযোগ।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে এই চুক্তি ওয়াশিংটনের প্রতি একটি সংকেত যে, ভারতকে আমেরিকা 'সব মেনে নেওয়া মিত্র' হিসেবে ভাবতে পারবে না।
অজয় মালহোত্রা বলেন, মস্কো ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব কোনো 'জিরো-সাম গেম' বা একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি নয়; বরং এটি ভারতের কৌশলগত ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার একটি প্রয়াস।
এমআই