আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলবে। তবে তা হবে ফোনে। ওদিকে তিনি তার প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর বাতিল করেন। কারণ ইরান আলোচনায় অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল। রোববার ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তিনি কূটনৈতিক সফর স্থগিত করেছেন। ইরানকে বলেছেন তারা চাইলে ফোন করতে পারে অথবা ওয়াশিংটনে গিয়ে আলোচনা করতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।
ট্রাম্প বলেন, সব তাস এখন আমাদের হাতেই। শক্তিশালী অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ১৮ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা করে পাকিস্তানে প্রতিনিধি পাঠাবে না। তারা জানে চুক্তিতে কী থাকতে হবে। তারা পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না, নইলে আলোচনার কোনো প্রয়োজনই নেই। তবে তিনি যোগ করেন, এর অর্থ এই নয় যে আবার শত্রুতা শুরু হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের ভূমিকারও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে এবং ইসলামাবাদ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে। ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা এটা (শান্তি আলোচনা) ফোনেই করব।
এদিকে পাকিস্তানে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম এক টুইটে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরের নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন, যা যুদ্ধ বন্ধ ও অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আরাঘচির সফরের ব্যবস্থাপনাতেও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই বক্তব্যগুলো আসে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসলামাবাদ থেকে মস্কোর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার পর। এর আগে তিনি মাসকাট সফর করেন। সেখানে তিনি ওমানের নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইরানি প্রতিনিধি শনিবারও ইসলামাবাদে ছিলেন। সেখানে তিনি সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন। রোববার আরাঘচি পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে শেষ করার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন। এরপর তিনি মস্কোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই দ্বিতীয় সফরের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার সরাসরি সম্পর্ক নেই। বরং এটি তার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পরামর্শ অব্যাহত রাখার অংশ। এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা। ট্রাম্পের বক্তব্যের পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আপাতত পরবর্তী দফার আলোচনা ইসলামাবাদে হচ্ছে না। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এক বিবৃতিতে জানান, সেরেনা হোটেল ও রেড জোনের আশপাশের সব বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হয়েছে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের ধৈর্য ও সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। কয়েকদিন ধরে তারা যানজট ও রাস্তা বন্ধ থাকার ভোগান্তি সহ্য করেছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, রোববার যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর দুটি সি-১৭ পরিবহন বিমান, যা নিরাপত্তা কর্মী, সরঞ্জাম ও যানবাহন বহন করছিল, তা পাকিস্তান ত্যাগ করেছে।
মাসকাটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিককে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও শান্তি প্রচেষ্টায় ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন বলে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। সুলতান সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্বের ওপর জোর দেন। রয়টার্স জানায়, তারা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা করেছেন এবং আরাঘচি বাইরের হস্তক্ষেপমুক্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর আহ্বান জানিয়েছেন। আরাঘচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জসিম আল থানি। তারা অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
এছাড়া আরাঘচি সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেন। বার্তা সংস্থা ইরনার খবরে বলা হয়, তিনি ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সালের সঙ্গে ফোনালাপে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থা জানায়, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও আরাঘচির আলোচনায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি উঠে আসে। রয়টার্স জানিয়েছে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকদের সঙ্গেও কথা বলেছেন।
ওদিকে যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়ছে। কারণ হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ। ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের। তারা বলেছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং এর প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রভাব বজায় রাখা ইরানের কৌশল। আইআরজিসি আরও সতর্ক করে বলেছে, নতুন করে কোনো আগ্রাসন হলে তারা প্রত্যাশার বাইরে কঠোর জবাব দেবে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ভুল হিসাব বা নতুন আক্রমণ ঘটলে তা ‘নরকীয় ঝড়ের’ সূচনা করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে আটক করেছে, যা অবরোধ ভেঙে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ‘সেভান’ নামের জাহাজটি ১৯টি জাহাজের একটি ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ ছিল, যা ইরানি তেল ও গ্যাস বিদেশে সরবরাহ করছিল। অবরোধ শুরুর পর এ পর্যন্ত ৩৭টি জাহাজকে অন্য পথে পাঠানো হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে।
অন্যদিকে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এবং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ফোনালাপে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জরুরি প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা করেন। আল জাজিরা জানায়, ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের অগ্রগতিও তুলে ধরেছেন, যার লক্ষ্য সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
এমআই