শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

বিশ্বের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে চীনে গেলেও বড় কোনো চুক্তি করতে পারেননি ট্রাম্প

শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬
বিশ্বের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে চীনে গেলেও বড় কোনো চুক্তি করতে পারেননি ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিংয়ে চূড়ান্ত দফার বৈঠক শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড দাবি করেছেন, তিনি 'অসাধারণ সব বাণিজ্য চুক্তি করেছেন, যা দুই দেশের জন্যই দারুণ লাভজনক হবে।' 

চীন সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে কৃষি, বিমান চলাচল, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের একটি প্রতিনিধিদল ছিল। দুই দেশের সম্পর্ককে ট্রাম্প 'বিশ্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক' বলে আখ্যা দিয়েছেন। 

তবে এই সম্মেলনটি কোনো বাস্তব অর্থনৈতিক অর্জনের চেয়ে বরং উষ্ণ বক্তব্য ও আনুষ্ঠানিকতাতেই বেশি সীমাবদ্ধ ছিল। প্রথম দিনের জমকালো আয়োজন এবং ইতিবাচক আলোচনার পরও কোনো বড় ধরনের বাণিজ্যিক অগ্রগতি বা উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক চুক্তির ঘোষণা আসেনি। 

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ও শি দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। হোয়াইট হাউস এটিকে 'অত্যন্ত ফলপ্রসূ' বলে উল্লেখ করেছে। গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ দাঁড়িয়ে ট্রাম্প এই বৈঠককে 'সম্ভবত সর্বকালের সবচেয়ে বড় সম্মেলন' বলে দাবি করেছেন।

অন্যদিকে শি বলেন, এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বাণিজ্য আলোচনায় 'অগ্রগতি' হয়েছিল। তবে তাইওয়ান ইস্যুতে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, 'পরিস্থিতি ঠিকমতো সামলাতে না পারলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ, এমনকি যুদ্ধও হতে পারে।' 

চুক্তি নেই, তবে ভঙ্গুর বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বহাল 

এত আয়োজনের পরও কোনো বড় বাণিজ্য চুক্তি বা কাঠামোগত সমঝোতা সই হয়নি।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে। প্রায় এক দশক পর চীন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বাণিজ্যিক বিমান কিনছে।

তবে বিশ্লেষকরা এর চেয়েও বড় অর্ডারের প্রত্যাশা করেছিলেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বোয়িংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।

গত অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে যে 'বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি' (ট্রেড ট্রুস) হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটন চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ স্থগিত করেছিল এবং বেইজিংও বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) রপ্তানিতে বিধিনিষেধ শিথিল করেছিল। 

ট্রাম্পের সফরসঙ্গী যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শুক্রবার ব্লুমবার্গ টিভিকে বলেন, নভেম্বরের পর এই বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। 

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন করে শুল্ক আলোচনায় না গিয়ে সম্পর্ক পরিচালনার জন্য দুই নেতা একটি 'বোর্ড অব ট্রেড' গঠনে সম্মত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট, যিনি ওয়াশিংটনের পক্ষে বাণিজ্য আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভবিষ্যতে বিনিয়োগে সহায়তার জন্য একটি 'মেকানিজম' তৈরির ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রগতি আশা করছেন। 

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এগুলো পুরোপুরি চালু হওয়ার আগে এখনো অনেক কাজ বাকি।

গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিতে 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভেদের জায়গাটি এখনো প্রযুক্তি। 

বাণিজ্যকে প্রাধান্য দেওয়া এই সফরে পিট হেগসেথ, মার্কো রুবিও এবং জেমিসন গ্রিয়ারের মতো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পেছনে ফেলে সবার আগে বিমান থেকে নামেন ইলন মাস্ক।  

স্বাগত অনুষ্ঠানেও মাস্ক এবং এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং ট্রাম্পের খুব কাছাকাছি ছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে বৈদ্যুতিক গাড়ি, এআই এবং সেমিকন্ডাক্টর এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এই দুই কোম্পানির ব্যবসাই চীনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। টেসলা তাদের সাংহাই গিগাফ্যাক্টরি এবং চীনা ক্রেতাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে এআই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে এনভিডিয়া।

হুয়াংয়ের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ মূল প্রতিনিধিদলের তালিকায় তার নাম ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে এআই এবং চিপের বিষয়টি আলোচনায় ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও প্রথম দিনের আলোচনার সারসংক্ষেপে এর কোনো উল্লেখ ছিল না।

উন্নত সেমিকন্ডাক্টর এবং চিপ তৈরির সরঞ্জামের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত রপ্তানি এখনো বহাল রয়েছে। মূলত এআইয়ের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করতেই এই পদক্ষেপ। তবে গ্রিয়ার জানিয়েছেন, এবারের আলোচনায় এটি কোনো প্রধান বিষয় ছিল না। 

বেইজিং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তারা তাদের শিল্প বিকাশে বাধা সৃষ্টির মার্কিন প্রচেষ্টার সমালোচনাও করছে। 

ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্ট জানিয়েছেন, সম্মেলনে প্রতিনিধিরা এআইয়ের নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি আরও বলেন, এআইয়ের ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখাটা 'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ'। 

এদিকে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, 'চীন ওই লোকদের (তার সঙ্গে আসা নির্বাহী) কোম্পানিতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে।' তবে তিনি এ বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু জানাননি।  

সবচেয়ে 'স্পর্শকাতর' ইস্যু

এই সম্মেলনে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি দেখা গেছে, তা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিং এখন তাইওয়ান ইস্যুকে সরাসরি যুক্ত করছে। 

গত এক বছরের বাণিজ্য আলোচনায় তাইওয়ানকে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার কয়েকটি বিরোধপূর্ণ বিষয়ের একটি হিসেবে দেখা হতো। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান বাণিজ্য সম্পর্ক এবং তাইপেকে অস্ত্র বিক্রির মতো বিষয়গুলোর জন্য এ বিরোধ বজায় ছিল। 

কিন্তু এবারের বৈঠক থেকে চীনের বার্তায় স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ানকে একটি প্রধান শর্ত হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। 

বেইজিংয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিং বলেছেন, 'গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতার' ভিত্তিতে দুই পক্ষ সম্পর্কের একটি 'নতুন অবস্থান' তৈরিতে সম্মত হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে তাইওয়ান এখনো সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আলোচনায় শি জিনপিং সতর্ক করে বলেছেন, 'চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ান প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।'

তিনি বলেন, 'এ পরিস্থিতি ঠিকমতো সামলাতে না পারলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ, এমনকি যুদ্ধও হতে পারে।'

আলোচনায় রয়েছে ইরানও 

ট্রাম্প এই আলোচনায় ইরান সংঘাত এবং তেলের বাজারের স্থিতিশীলতার বিষয়ে চীনের সহযোগিতাও আশা করেছিলেন।

ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, 'তিনি (শি জিনপিং) হরমুজ প্রণালি খোলা দেখতে চান এবং বলেছেন, "আমি যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি, তবে আমি সাহায্য করতে চাই।"'

শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে 'সর্বাত্মক এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির' আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, 'আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নৌপথগুলো যত দ্রুত সম্ভব আবার খুলে দেওয়া উচিত।'

ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে চীন চাইলে ইরানের ওপর তাদের প্রভাব খাটাতে পারে। চীনের দেওয়া তথ্যেও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। 

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

আশা করা হচ্ছে, সেই সম্মেলনের আগে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা হবে। আর সেই আলোচনার মাধ্যমেই হয়তো বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি এমন কোনো বড় চুক্তি করতে পারবে, যা এবার সম্ভব হয়নি। 

এমআই 


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল