শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

ভিডিও কলে বাবার কুরবানী, নিরব রুমে সন্তানের ঈদ

শুক্রবার, মে ২৯, ২০২৬
ভিডিও কলে বাবার কুরবানী, নিরব রুমে সন্তানের ঈদ

মোঃ হৃদয়:

ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, একসাথে খাবার টেবিলে বসা, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা আর কুরবানীর ব্যস্ততায় ভরা একটি দিন। তবে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা প্রবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য এই দিনটি হয়ে ওঠে ভিন্নরকম। ফোনের স্ক্রিনে পরিবারের হাসিমুখ দেখা গেলেও ছুঁয়ে দেখা যায় না সেই মুহূর্তগুলোকে। ভিডিও কলে কুরবানী দেখলেও পাশে বসে ঈদ উদযাপনের অনুভূতিটা থেকে যায় অধরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা এমন কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ঈদের অনুভূতির কথা শুনেছেন সময় জার্নালের ডিআইইউ প্রতিনিধি মোঃ হৃদয় ।
 
আমাকে ছাড়া ঈদটা অসম্পূর্ণ

দক্ষিণ কোরিয়ার সেজং ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছেন ইশা। প্রায় ছয় মাস ধরে প্রবাসে থাকা এই শিক্ষার্থীর জন্য এবারই প্রথম দেশের বাইরে কুরবানীর ঈদ।

ঈদের সকালের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “ঘুম থেকে উঠেই একটু অন্যরকম লাগছিল। চারপাশ শান্ত ছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল দেশে থাকলে বাসার সবাই কত ব্যস্ত থাকত। সেই পরিচিত ঈদের আমেজটা খুব মিস করছিলাম।”

দেশের কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল জানতে চাইলে ইশা বলেন, “সকালে আব্বুর সাথে ঈদের প্রস্তুতি, আম্মুর রান্নাঘরের ব্যস্ততা আর আত্মীয়স্বজনদের বাসায় আসা এসব সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল।”

পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “ভিডিও কল ধরার পর মনে হচ্ছিল আমি বাসার খুব কাছেই আছি। সবাইকে একসাথে দেখে অনেক ভালো লাগছিল, আবার একটু খারাপও লাগছিল যে পাশে থাকতে পারছি না।”

সবচেয়ে আবেগপ্রবণ মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আম্মু-আব্বুকে একসাথে দেখে সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। বিশেষ করে তারা যখন বলছিল আমাকে ছাড়া ঈদটা অসম্পূর্ণ লাগছে।”

ফোন কেটে দেওয়ার পর কিছু সময় নিজেকে খুব শূন্য লাগছিল বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, “তখন বুঝতে পারছিলাম পরিবার থেকে দূরে ঈদ করা আসলে কতটা কঠিন।”

ইশা মনে করেন, প্রথম প্রবাসী ঈদ তাকে পরিবার ও কাছের মানুষদের মূল্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে।

ভিডিও কলে দেখেছি পুরো কুরবানীর আয়োজন

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে আইটি বিষয়ে পড়ছেন তাহমীদ হোসেন। প্রায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রবাসে থাকা এই শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজও করেন।

ঈদের দিন কাজ থেকে ছুটি নিয়েছিলেন জানিয়ে তাহমীদ বলেন, “প্রবাসে সব সময় ছুটি ম্যানেজ করা সহজ হয় না। তবুও ঈদের অনুভূতিটা একটু হলেও নিজের মতো করে অনুভব করার জন্য ওই দিনটা অফ রেখেছিলাম।”

দেশে পরিবারের কুরবানীর ব্যস্ততা তিনি দেখেছেন ফোনের স্ক্রিনে। তাহমীদের ভাষায়, “বাসায় কুরবানীর প্রস্তুতি, গরু জবাই, সবার ব্যস্ততা, গোস্ত কাটা— সব কিছু ফোনের স্ক্রিনের মাধ্যমে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি যেন ওদের মাঝেই আছি, কিন্তু বাস্তবে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে।”

ভিডিও কল কিছু সময়ের জন্য দূরত্ব কমিয়ে দিলেও, কল শেষ হওয়ার পর একাকীত্বটা আরও বেশি অনুভূত হয় বলে জানান তিনি।

পরিবারের আনন্দ দেখার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তাহমীদ বলেন, “একদিকে অনেক ভালো লাগছিল যে সবাই ভালো আছে, আনন্দ করছে। কিন্তু অন্যদিকে একটা চাপা কষ্টও কাজ করছিল। কারণ আমি শুধু দেখছিলাম, কিন্তু সেই মুহূর্তগুলোর অংশ হতে পারছিলাম না।”

প্রবাস জীবন মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে, তবে একই সঙ্গে অনেক কিছু থেকে দূরে সরিয়ে দেয় বলেও মনে করেন তিনি। তাহমীদের ভাষায়, “ঈদের দিনগুলোতে এই বিষয়টা সবচেয়ে বেশি অনুভব হয়।”

সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ভিডিও কলে সবাইকে একসাথে হাসতে, গল্প করতে আর কুরবানীর ব্যস্ততায় থাকতে দেখছিলাম। তখন খুব ইচ্ছা করছিল পাশে থাকতে, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম বাস্তবতা ভিন্ন।”

তবুও এই দূরে থাকাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণের অংশ হিসেবেই দেখেন তিনি।

আম্মুর হাতের রান্নার স্বাদ আর কোথাও পাই না

জাপানের এএফসি ইন্টারন্যাশনাল একাডেমিতে ভাষা কোর্সে অধ্যয়নরত মো. আবিদ হাসান প্রায় এক বছর ধরে প্রবাসে আছেন। বিদেশে থাকলেও পরিবারের সঙ্গে প্রতিদিনই কথা হয় তার। তবে কুরবানীর ঈদ এলেই পরিবারের অভাবটা আরও বেশি অনুভব করেন তিনি।

আবিদ বলেন, “সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আম্মুকে। দেশে থাকলে ঈদের সকালে সবাই নামাজ পড়ে এসে একসাথে গরু কাটাকাটি, রান্নাবান্না আর পরিবারের সবাই মিলে খাওয়ার যে আনন্দ সেটা এখানে থেকে খুব মিস করি।”

বাবার কুরবানী নিয়ে ব্যস্ততা আর পরিবারের সবার ছোটাছুটি দেখে বারবার মনে হয়, যদি দেশেই থাকতে পারতেন। তিনি বলেন, “আজ যদি দেশেই থাকতাম তাহলে আমিও সবার সাথে একসাথে গরু কাটতাম, রান্না করতাম, আর পরিবারের সাথে বসে খেতাম।”

প্রবাসের খাবারের সঙ্গে মায়ের হাতের রান্নার তুলনা করতে গিয়ে আবিদ বলেন, “এখানেও খাওয়া হয়, কিন্তু আম্মুর হাতের রান্না আর নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ার মাঝে অনেক পার্থক্য। সেই স্বাদ, সেই ভালোবাসা আর কোথাও পাওয়া যায় না।”

পরিবার সবসময় তাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলেও জানান তিনি। “বাবা বলেন, ‘তুমি অনেক মাংস কিনে আনো, মন মতো রান্না করে খাও। দেশে যেমন খেতে, তেমনই খাও।’ তারপর খাওয়ার সময় ভিডিও কলে দেখাতে বলেন,” যোগ করেন আবিদ।

তবে ভিডিও কলে সব দেখা গেলেও, পরিবারের পাশে বসে একসাথে ঈদ উদযাপন করার অনুভূতিটাই সবচেয়ে বেশি মিস করেন এই প্রবাসী শিক্ষার্থীরা।

একে


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল