শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

ইসলামি ব্যাংক নিয়ে এত আলোচনা কেন?

শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬
ইসলামি ব্যাংক নিয়ে এত আলোচনা কেন?

মো: সোহাগ আলী:

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংকিং এখন কেবল একটি আর্থিক মডেল নয়—এটি একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি, ক্ষমতার কাঠামো এবং আস্থার সংকটকে একসাথে ধারণ করা একটি জটিল বাস্তবতা। এই আলোচনার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক যুক্তি নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর, নিয়ন্ত্রণের লড়াই এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা কাজ করছে।

বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সূচনা মূলত সুদবিহীন আর্থিক ব্যবস্থার ধারণা থেকে, যেখানে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ ও লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বকে কেন্দ্র করে একটি বিকল্প ব্যাংকিং কাঠামো তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে ১৯৮০-এর দশকে, এবং পরবর্তীতে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে ধর্মীয় মূল্যবোধ, প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং তুলনামূলক উচ্চ আস্থার কারণে। এই ধারার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে আসে Islami Bank Bangladesh PLC, যা দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক হিসেবেও পরিচিত।

কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস যতটা আর্থিক, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক ও কাঠামোগত। বিশেষ করে ২০১৭ সাল ছিল ইসলামী ব্যাংকিং খাতের একটি টার্নিং পয়েন্ট, যখন ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সেই সময় এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তার এবং বোর্ড পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় গভীর পরিবর্তন আসে।

 বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, এই পরিবর্তনকে ঘিরে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, ঋণখেলাপী এবং প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ উঠে আসে, যা ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি করে।

এই ২০১৭ সালের ঘটনাপ্রবাহকে অনেকে “কাঠামোগত টেকওভার” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর্পোরেট ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও ঘনীভূত হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে একাধিক ব্যাংকে একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের অভিযোগ উঠে, যা ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।
এই বিতর্কের আরেকটি বড় মাত্রা হলো নিয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় অনেক ব্যাংকিং পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাব ও নেটওয়ার্ক নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয় এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সাম্প্রতিক সময়ে আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বোর্ড পরিবর্তন এবং নতুন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে পুনরায় নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনে আনার চেষ্টা চলছে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হচ্ছে—আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং পূর্ববর্তী অনিয়মের প্রভাব কমানো।

একজন ব্যাংকিং বিশ্লেষকের মতে, “ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি একইসাথে আস্থাভিত্তিক ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি খাত। ফলে এখানে যে কোনো পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করে।”

অন্যদিকে সাধারণ আমানতকারীদের দৃষ্টিতে এই আলোচনা আরও সরল—তাদের প্রধান উদ্বেগ তাদের অর্থের নিরাপত্তা। মালিকানা বা বোর্ড পরিবর্তনের খবরে অনেক সময়ই আস্থার ওঠানামা দেখা যায়, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে এত আলোচনা হওয়ার কারণ একক কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফল—যেখানে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আদর্শিক ভিত্তি, ২০১৭ সালের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন, নিয়োগ ও প্রশাসনিক বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক বোর্ড পুনর্গঠন—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।

এই বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংক এখন শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ক্ষমতা, আস্থা এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর একটি প্রতীকী ক্ষেত্র।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেরোবি


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল