বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিশ্ব বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও প্রক্টরসহ ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ থামার পর সেখানে অভিযানে নেমেছে যৌথবাহিনী।
রোববার (৩১ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে যৌথবাহিনী অভিযান শুরু করেছে। এ সময় ক্যাম্পাসের আশপাশে যৌথবাহিনীর অন্তত ১০টি গাড়ি প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
এর আগে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট সংলগ্ন এলাকায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন।
জানা যায়, দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত টানা সংঘর্ষ চললেও এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। বিকেল সাড়ে ৩টায় হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন সই করা বিজ্ঞপ্তিতে ১৪৪ ধারা চালু হলে এর প্রায় ৩০ মিনিট পরে ঘটনাস্থলে আসেন যৌথবাহিনীর সদস্যরা।
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন এক আদেশে জানান, রোববার দুপুর ২টা থেকে আগামীকাল (১ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ, মিছিল, গণজমায়েত, বিস্ফোরক দ্রব্য, আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র বহনসহ পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির একত্রিত হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর বিকাল পৌনে ৪টার সময় সেনাবাহিনী এসে এলাকায় অভিযান চালায়।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত ১১টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক নারী শিক্ষার্থী ২ নম্বর গেট এলাকার কাঁচাবাজার সংলগ্ন ভাড়া বাসায় প্রবেশ করতে গেলে রাত ১১টার পর বাসায় ঢুকতে পারবে না বলে বাধা দেওয়া হয়। এ সময় দারোয়ানের সঙ্গে ছাত্রীর বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে তাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এ সময় দারোয়ান নারী শিক্ষার্থীর গায়ে আঘাত করে।
খবর পেয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী এগিয়ে এলে স্থানীয়রা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় মসজিদের মাইক ব্যবহার করে স্থানীয়রা আরও লোকজন জড়ো করে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর চারদিক থেকে হামলা চালায়। এতে টানা চার ঘণ্টা ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করে। ওই ঘটনায় অন্তত শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এর মধ্যে অন্তত ১৫ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ
রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাতের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই স্থানীয়রা আসিফ ভিলা নামক এক বাসায় অবস্থানরত কয়েকজন শিক্ষার্থীকে অবরুদ্ধ করে রাখে। খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ধারে গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে আবারো সংঘর্ষ হয়। স্থানীয়রা দেশীয় অস্ত্র, ইট-পাটকেল নিয়ে আক্রমণ চালায়।
এ সময় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ড. মো. কামাল উদ্দিন ঘটনাস্থলে গেলে তিনিও ইটের আঘাতে আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. তানভীর হায়দার আরিফ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঘটনাস্থলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর আগে দুই সহকারী প্রক্টরসহ দ্বিতীয় দফায় অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রোববারের সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য বহু শিক্ষার্থীকে চবি মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয় এবং গুরুতর অবস্থায় কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ প্রাইভেট হাসপাতালে পাঠানো হয়।
চবি মেডিকেলের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. টিপু সুলতান জানান, আমরা বহু আহত শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছি। গুরুতরদের চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আমার জীবনে এমন ঘটনা কখনো দেখিনি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা শাখাকে ফাঁকা গুলি করতেও দেখা গেছে। তবে, বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যায়নি। বিকালে ৪টার দিকে যৌথ বাহিনীর নেতৃত্বে অভিযান চালালে ক্যাম্পাসের পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ড. কামাল উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনা করে মারা হচ্ছে। আমরা প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ফোন দিয়েও কোনো সহযোগিতা পাইনি। নইলে আমাদের এত শিক্ষার্থী কখনো আহত হতো না।
এমআই