শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

গানের জাদুতে মুগ্ধ কোটি শ্রোতা, অথচ গায়িকার অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ!

শনিবার, জানুয়ারী ১৭, ২০২৬
গানের জাদুতে মুগ্ধ কোটি শ্রোতা, অথচ গায়িকার অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ!

বিনোদন ডেস্ক:

সিয়েনা রোজের সময়টা দারুণ যাচ্ছে। স্পটিফাইয়ের 'ভাইরাল টপ ৫০' তালিকায় তার তিনটি গান জায়গা করে নিয়েছে। জ্যাজ ও সোল ঘরানার এই গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় 'ইনটু দ্য ব্লু'। গানটি ইতিমধ্যে ৫০ লাখ বারের বেশি শোনা হয়েছে।

সব কিছু ঠিক থাকলে রোজ এই বছরের অন্যতম সেরা নতুন তারকা হতে পারতেন।

কিন্তু সমস্যা একটাই। সব লক্ষণ বলছে, তিনি আসলে রক্তমাংসের কোনো মানুষ নন।

মিউজিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম 'ডিজার' বিবিসিকে জানিয়েছে, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে গান শনাক্ত করার টুল তৈরি করেছে। তাদের পরীক্ষায় রোজের অনেক অ্যালবাম ও গান 'কম্পিউটারে তৈরি' বলে ধরা পড়েছে।

ভালো করে লক্ষ্য করলেই এআই শিল্পীর ছাপগুলো চোখে পড়ে। রোজের কোনো সোশ্যাল মিডিয়া নেই, তিনি কখনো কোনো কনসার্ট করেননি, তার কোনো ভিডিও নেই। অথচ খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি অবিশ্বাস্য সংখ্যক গান প্রকাশ করেছেন।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে অন্তত ৪৫টি গান আপলোড করেছেন। প্রিন্সের মতো শিল্পী, যিনি বিরামহীন সৃষ্টির জন্য পরিচিত ছিলেন, তার পক্ষেও এত অল্প সময়ে এত গান করা কঠিন ছিল।

তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে বন্ধ আছে। সেখানে কিছু ছবি ছিল, যা দেখতে একই রকম। এআই দিয়ে ছবি বানালে যেমন অদ্ভুত আলো ও অবাস্তব ভাব থাকে, রোজের ছবিতেও ঠিক তাই ছিল।

এরপর আসা যাক গানের কথায়। 'ইনটু দ্য ব্লু' এবং 'ব্রিদ অ্যাগেইন'-এর মতো গানগুলো নোরা জোনস বা অ্যালিসিয়া কিজের গানের মতোই শুনতে লাগে। জ্যাজ গিটারের সুর আর মাখনের মতো মসৃণ গলা।

তবে অনেক শ্রোতা গানে 'হিসহিস' শব্দ বা যান্ত্রিক ত্রুটি লক্ষ্য করেছেন। 'আন্ডার দ্য রেইন' বা 'ব্রিদ অ্যাগেইন' গানগুলো চালালেই পুরোটা সময় জুড়ে এই শব্দ শোনা যায়।

এই গায়িকা ঘিরে যে রহস্য তৈরি হয়েছে, তা এআই-জেনারেটেড মিউজিক নিয়ে আরও বড় বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

সুনো এবং উডিওর মতো অ্যাপে গান বানালে এমনটা হয়। কারণ এই অ্যাপগুলো 'হোয়াইট নয়েজ' বা ঝিরঝিরে শব্দ থেকে গান তৈরি শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সেটাকে সুরে রূপান্তর করে।

ডিজারের গবেষক গ্যাব্রিয়েল মেসগের-ব্রোকাল বলেন, 'সফটওয়্যার যখন গানের সব স্তর ও বাদ্যযন্ত্র যোগ করে, তখন কিছু ভুল থেকে যায়। আমরা হয়তো কানে শুনে সেটা বুঝতে পারি না, কিন্তু গাণিতিক হিসাব করলেই ধরা পড়ে।'

এই ত্রুটিগুলো অনেকটা আঙুলের ছাপের মতো। মেসগের-ব্রোকাল জানান, প্রতিটি সফটওয়্যারের নিজস্ব 'স্বাক্ষর' থাকে। ফলে কোন সফটওয়্যার দিয়ে গানটি বানানো হয়েছে, তাও ধরা সম্ভব।

সাধারণ শ্রোতারাও কিছু অসংগতি টের পাচ্ছেন। ড্রামের তালে গরমিল, গানের কথার কোনো গভীরতা নেই এবং গায়িকা কখনোই সুরের বাইরে যাচ্ছেন না বা আবেগের ওঠানামা নেই।

এই 'গৎবাঁধা' আওয়াজই অনেক শ্রোতার মনে সন্দেহের দানা বাঁধিয়েছে।

টিকটকের মিউজিক সমালোচক এলোসি৫৭ বলেন, 'শুরুতে আমার ভালোই লেগেছিল। কিন্তু তারপর মনে হলো এতে অদ্ভুত বা খাপছাড়া কিছু একটা আছে। তার প্রোফাইল ঘেঁটে মনে হলো, এটা নিশ্চিত এআই।'

এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একজন লিখেছেন, 'আমি অলিভিয়া ডিনের গান শুনছিলাম। দুই দিনের মাথায় স্পটিফাই আমাকে সিয়েনা রোজের গান সাজেস্ট করল। শুনতে একই রকম, কিন্তু বড্ড যান্ত্রিক। কয়েকটা গান শোনার পরই বুঝলাম সে এআই।'

ব্রডকাস্টার জেমা কেয়ারনি বিবিসি রেডিও ৪-এ বলেছেন, 'তার ছবিগুলো একটু অবাস্তব লাগে... আর গানগুলো শুনলে মনে হয় আত্মার স্পর্শ নেই।'

অবশ্য অনেকেই রোজের গানের প্রেমে পড়েছেন। তাদের মধ্যে পপ তারকা সেলেনা গোমেজও আছেন। গত রোববার গোল্ডেন গ্লোবস নিয়ে এক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তিনি রোজের 'হয়্যার ইউর ওয়ার্মথ বিগিনস' গানটি ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করেছিলেন।

রোজের পরিচয় নিয়ে অনলাইনে আলোচনা শুরু হওয়ার পর গানটি সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু গোমেজের পোস্টের কারণে রোজের পরিচয় নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে ওঠে।

রোজের অস্তিত্ব নেই জেনে অনেক শ্রোতা হতাশ হয়েছেন। একজন থ্রেডস অ্যাপে লিখেছেন, 'দয়া করে কেউ বলুন সে সত্যি।'

ব্লুস্কাই-এ আরেকজন লিখেছেন, 'আমি হতাশ কারণ তার কিছু গান খারাপ ছিল না। কিন্তু কেউ একজন বলল এটা শোনার পর 'আত্মাহীন' মনে হয়, আর আমি সেটা মেনে নিয়েছি।'


টাইডাল স্ট্রিমিং সার্ভিসে সিয়েনা রোজের অ্যালবামের আর্টওয়ার্কে ভিন্ন ভিন্ন গায়ক-গায়িকাদের ছবি দেখা যায়।
এআই গানের ভবিষ্যৎ

অবশ্য এমনও হতে পারে যে সবাই ভুল ভাবছে। হয়তো সিয়েনা রোজ সত্যিকারের কোনো লাজুক গায়িকা। অথবা কোনো শিল্পী ছদ্মনামে গান প্রকাশ করছেন।

যদি তাই হয়, তবে তা দুঃখজনক। নিজের গানকে 'আত্মাহীন জঞ্জাল' বা এআই বলে তকমা পেতে দেখা যে কোনো শিল্পীর জন্যই কষ্টের। তবে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এখন এটাই বড় সমস্যা।

এআই সফটওয়্যার এখন এতটাই উন্নত যে নকল বা ক্লোন শিল্পীরা আসল শিল্পীদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে।

এই সপ্তাহে সুইডেনে টপ চার্টে থাকা 'জ্যাকুব' নামের এক শিল্পীর গান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাংবাদিকরা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, এই নামে কোনো শিল্পীর অস্তিত্বই নেই।

টেক কোম্পানি এবং মিউজিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকেই চান এআই সফল হোক।

সিয়েনা রোজের মতো শিল্পী তৈরি করতে খরচ প্রায় শূন্য। অথচ তার গান থেকে সপ্তাহে আনুমানিক ২ হাজার পাউন্ড রয়্যালটি আসছে।

এর সঙ্গে কে-পপ ইন্ডাস্ট্রির তুলনা করুন। সেখানে একটি ছেলে বা মেয়েদের ব্যান্ডের প্রতিটি সদস্যের পেছনে বছরে গড়ে ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। তাই কোম্পানিগুলোর কাছে এআই বেশ আকর্ষণীয়।

মজার ব্যাপার হলো, রোজের বেশ কিছু গানের স্বত্ব 'ব্রোক' নামের এক মার্কিন ইন্ডি রেকর্ড লেবেলের নামে। এই লেবেলটি ভাইরাল শিল্পীদের তারকা বানানোর জন্য পরিচিত।

তাদের ওয়েবসাইটে রোজের নাম নেই। তবে ব্রিটিশ ড্যান্স অ্যাক্ট 'হেভেন'-এর নাম আছে। এই 'হেভেন' গত বছরের শেষের দিকে জর্জা স্মিথের কণ্ঠ এআই দিয়ে ক্লোন করে গান বানিয়ে বিপদে পড়েছিল।

কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের গান 'রান' স্ট্রিমিং সাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে মানুষের কণ্ঠে আবার রেকর্ড করার পর গানটি দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাজ্যের সেরা ১০-এ জায়গা করে নেয়।

বিবিসি ব্রোকের সঙ্গে সিয়েনা রোজের সম্পর্ক নিয়ে জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি।

'নস্টালজিক রেকর্ডস' নামে আরেকটি লেবেলের ওয়েবসাইটে রোজের নাম আছে। তারা দাবি করছে, রোজ লন্ডনের শিল্পী এবং তিনি 'শুধু গায়িকা নন, হৃদয়ের গল্পকার'।

পপ স্টার রে বলেছেন, ফ্যানরা কম্পিউটার-জেনারেটেড খালি অনুভূতির চেয়ে আসল, হৃদয়স্পর্শী সঙ্গীতকেই বেশি পছন্দ করেন।
ডিজার জানিয়েছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে আপলোড হওয়া গানের ৩৪ শতাংশই এখন এআই দিয়ে তৈরি। সংখ্যাটা প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার।

মেসগের-ব্রোকাল বলেন, 'মাত্র ১৮ মাস আগেও এটা ছিল ৫ বা ৬ শতাংশ। বৃদ্ধির হার সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।'

অনলাইন মিউজিক স্টোর ব্যান্ডক্যাম্প সব ধরনের এআই গান নিষিদ্ধ করেছে। তবে ডিজার বা স্পটিফাই এখনো অতটা কঠোর হয়নি।

স্পটিফাই এক বিবৃতিতে রোজের মতো শিল্পীদের উপস্থিতি সমর্থন করেছে। তারা বলেছে, 'এআই এবং নন-এআই গানের মধ্যে সীমারেখা টানা সবসময় সম্ভব নয়। স্পটিফাই নিজেরা গান বানায় না, আবার এআই টুলের তৈরি গানকে আটকাতেও চায় না।'

এদিকে এআই গানের বিরুদ্ধে শিল্পীদের ক্ষোভ বাড়ছে।

গত বছর পল ম্যাককার্টনি, কেট বুশ এবং ড্যামন অ্যালবার্নের মতো শিল্পীরা অনুমতি ছাড়া এআই মডেলে তাদের গান ব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

২০২৪ সালে আইভোর নোভেলো অ্যাওয়ার্ডসে পপ তারকা রে বলেছিলেন, ভক্তরা অ্যালগরিদমের তৈরি গানের চেয়ে আসল গানই বেছে নেবে।

তিনি বলেন, 'ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি সেরা লেখক হওয়ার জন্য লিখি না। আমি আমার গল্প বলার জন্য লিখি।'

একই অনুষ্ঠানে কোজি র‍্যাডিক্যাল হেসে বলেছিলেন, 'সবাই আমাকে রোবট নিয়ে কেন ভয় দেখাচ্ছে? আমি রোবটকে ভয় পাই না। আমিই জিতব।'

এমআই 


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল