অ আ আবীর আকাশ, লক্ষ্মীপুর:
লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন ইটভাটায় প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা না করে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই ইটভাটাগুলো। জেলা ও জেলার বাইরের বনাঞ্চলের গাছ ধ্বংস করে লাখ লাখ টন কাঠ পোড়ানো চলছে ভাটাগুলোতে। এসব ভাটার মধ্য কমলনগর উপজেলার চরমার্টিন ইউনিয়নের সাবধানে ক চেয়ারম্যান খুরশিদ আলমের ভাতিজা জাহাঙ্গীর আলম দলীয় প্রভাবে জেবিএম নামে অবৈধ ইটভাটা স্থাপন করে বম উজাড় করে কাঠ পোড়াচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী সীমান্তে লক্ষ্মীপুর অংশে চরবসুতে বনলতা, সিবিএল, চররমিজ ইউনিয়নের চর আফজাল গ্রামের আমানত ব্রিক্স (এএমএ) জেএসবি ব্রিক্স, কমলনগর উপজেলায় বৈধ ভাটা ৬ টি ও অবৈধ ১৪ ইটভাটা রয়েছে। অবৈধ ইটভাটাগুলো- তোরাবগন্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাগলা গ্রামে মদিনা ব্রিকস, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে হাসিনা ব্রিকস, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এলএমবি ব্রিকস, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রহিমগঞ্জে তাহেরা ব্রিকস, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এমআরবি রহিমা ব্রিকস, ৭ নম্বর ওয়ার্ড মদিনা ব্রিকস, ৮ নম্বর ওয়ার্ড নবাব ব্রিকস ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে গুলশান ব্রিকস ও চরকাদিরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে সুমাইয়া ব্রিকস, আল্লারদান,৫ নম্বর ওয়ার্ডে রহিমা ব্রিকস, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চরবসু এলাকায় আকাশ ব্রিকস, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভাই ভাই ব্রিকস, হাজিরহাট ইউনিয়নের মিয়াপাড়া মা ফাতেমা ব্রিকস ও চরকালকিনি ১ নম্বর ওয়ার্ডে শামিম ব্রিকস সহ মোট ১৪ টি অবৈধ ইটভাটা চলছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই চলছে এসব ইটভাটা। কোনো কোনো ভাটার তাও নেই। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছে পরিবেশের ভারসাম্য। উজাড় হচ্ছে বনজ সম্পদ।
সরকারি হিসেবে জেলায় ছোট বড় মিলিয়ে ১৫৫টি ইটভাটা থাকলেও এ বছর নতুন করে স্থাপিত ১০টি ভাটাসহ মোট ১৬৫ টি ভাটায় ইট পুড়ছে। এদের বেশিরভাগেরই অনুমোদন নেই। অবৈধভাবে গড়ে উঠা ৮০ ভাগ ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হয়। অনেকে ভাটার ভেতরেই ভ্রাম্যমাণ স’মিল বসিয়ে কাঠ চেরাই করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো বন্ধে প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি থাকলেও ইটভাটাগুলো বন্ধ করা,যাচ্ছে না। কারন হিসেবে জানা গেছে প্রশাসনের ভেতরে থাকা কর্মকর্তা। প্রশাসন ও সাংবাদিক নিয়ে ইটভাটা গুড়িয়ে দিলেও পর সময়ে ওই কর্মকর্তার যোগসাজসে পূণরায় ইটভাটা দাঁড়িয়ে যায়। এতে প্রশাসনের ঢিমেতালে ইট ভাটার ভেতরেই স্থাপন করা হয়েছে স মিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটা তৈরি করতে কমপক্ষে ৬ একর জমির প্রয়োজন হয়। ইটভাটার মালিকরা জমির মালিকদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে নিচ্ছে। এতে ফসলি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। কমে যাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এর ১৬ ধারায় বলা আছে, কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করেন, তাহলে তিনি অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
রামগতির চর আফজাল গ্রামের পল্লী চিকিৎসক ফয়সাল আহমেদ বলেন, যত্রতত্রো এসব ইটভাটার কারনে মানুষের বিভিন্ন রোগ বালাই দেখা দিয়েছে। সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ নানা কঠিন ও মারাক্তক হমকির মুখে রয়েছে এসব স্বাস্থ্য সুরক্ষা।
ইমতিয়াজ আহমেদ বুলবুল বলেন-প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে ইটভাটার মালিকরা কাঠ পোড়াচ্ছে। অধিকাংশ ইটভাটাগুলো রাস্তার পাশেই। ভাটার ধোঁয়া ও ধুলায় আমাদের চলাচল করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। ভাটার মাটি বহনের সময় রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে।
এছাড়া একটু বৃষ্টি হলেও সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। নানামুখি সমস্যা তৈরি করছে ইটভাটাগুলো।
সিবিএল ব্রিকসের মালিক চৌধুরী জানান, ভাটায় আগুন দিতে তিন থেকে চারশ মন কাঠ লাগে। কিন্তু জিগজাগ ভাটা (হাওয়া ভাটা) তৈরি করতে ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। কাঠ পোড়ানোর ফিক্সড চিমনির ভাটা ২৫ লাখ টাকা হলেও তৈরি করা সম্ভব। যে কারণে ফিক্সড চিমনির সংখ্যা বেশি।
লক্ষ্মীপুর সর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.কাজী আবদুল মোমিন বলেন, কাঠ পোড়ানোর ফলে ইটভাটার নির্গত কালো ধোয়ায় মানুষের হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা রোগের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও অতিরিক্ত কার্বনডাই অক্সাইডের কারণে মাঠের ফসল ও এলাকার পরিবেশ দূষণ হয়। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই দূষণ খুবই ক্ষতিকর। মহামারী দেখা দেওয়ার আগেই কাঠপোড়ানো অবৈধ ইটভাটাগুলোকে একেবারেই বন্ধ করা উচিৎ।
সামাজিক সংগঠন নিডো নির্বাহী পরিচালক অ আ আবীর আকাশ বলেন, আমরা ভাটা মালিকদের কাঠ পোড়াতে নিষেধ করেছি। তবে কাঠ পোড়ানোর বিষয়টা পরিবেশ অধিদপ্তরের। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ স’মিল বসিয়ে কাঠ চেরাই করলে অবশ্যই সেটা বাজেয়াপ্ত করা উচিৎ বলে মনে করি।
পরিবেশ অধিদপ্তর লক্ষ্মীপুরের উপ-পরিচালক হারুনুর রশিদ পাঠান বলেন, গত বছর আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছিল না তাই আমরা তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি। এবার আমাদের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট আছে। কোনো ভাটাতেই কাঠ পোড়াতে দেব না আমরা। খুব শিগগির অভিযান পরিচালনা করব।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন-পরিবেশ রক্ষার্থে আমরা বন বিভাগকে সাথে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করবো। কিছুতেই কাঠ পোড়াতে দিবো না।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসান বলেন, ভাটায় আগুন দেওয়ার জন্য কিছু কাঠ পোড়ানোর আবেদন করেছিল ভাটা মালিকরা। তবে এর থেকে অতিরিক্ত কাঠ পোড়ালে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালিয়ে কাঠ পোড়ানো বন্ধ করা হবে।
এমআই