মাশরিফা মিশকাত:
বাংলাদেশের প্রতিটি ভোর যেন এক নীরব যাত্রার সাক্ষী। প্রতিদিনই হাজারো মানুষ তাদের চিরচেনা গ্রাম, মেঠোপথ আর আপনজনকে পেছনে ফেলে, কিংবা কেউ হয়তো তার পুরো জীবনের জমানো সঞ্চয় নিয়ে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায়। গন্তব্যস্থল হলো ইট-পাথরের নগরী।
বাংলাদেশ মূলত একটি গ্রামীণ জনপদের দেশ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবন আবর্তিত হয়েছে গ্রামকে কেন্দ্র করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে নগরায়ণের গতি দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, খুলনা ও কুমিল্লার মতো শহরগুলোতে দিন দিন মানুষের আগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে গ্রামে একসময় শান্তির সুবাতাস বইত, আজ সেখানে কর্মসংস্থানের অভাব আর অনুন্নত নাগরিক সুবিধার দীর্ঘশ্বাস। চোখে নতুন কিছু করার স্বপ্ন আর পেটের তাগিদ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আজ গ্রামীণ জনপদ বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে মানুষের এই শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা বা ‘অভিবাসন’ এক কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ফলে আগের মতো শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে না। অন্যদিকে, শহরে কল-কারখানা, বিশেষ করে পোশাক শিল্প ও সেবা খাতে কাজের ব্যাপক সুযোগ থাকায় মানুষ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। জমির পরিমাণ কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যও অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে অনেক তরুণ কৃষিকে ভবিষ্যতের পেশা হিসেবে দেখতে আগ্রহ হারাচ্ছে।
অন্যদিকে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস এবং সেবাভিত্তিক চাকরির বেশিরভাগ সুযোগ শহরকেন্দ্রিক। তাই জীবিকার নিশ্চয়তা খুঁজতে মানুষ শহরের পথে পা বাড়ায়। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা ও নগর পরিকল্পনাবিদদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৫০০ মানুষ শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। এই বিশাল জনস্রোতের একটি বড় অংশ আসে নদীভাঙনকবলিত এলাকা এবং কর্মসংস্থানহীন গ্রামগুলো থেকে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে শহরগুলো আজ বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট ও আবাসন সংকট। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা বস্তিবাসী হিসেবে হলেও শহরে আশ্রয় নিচ্ছে।
শিক্ষাও শহরমুখী জনস্রোতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে ভালো শিক্ষা ছাড়া উন্নত জীবন কল্পনা করা কঠিন। যদিও দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, তবুও মানসম্মত শিক্ষা এখনো মূলত শহরকেন্দ্রিক। অনেক পরিবার সন্তানের ভালো স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে। একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রায়ই পুরো পরিবার স্থানান্তরিত হয়। ফলে শিক্ষা শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবারকেই শহরমুখী করে তোলে।
মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য যেমন শহর বেছে নিচ্ছে, তেমনি জটিল রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারগুলো শহরে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো চিকিৎসার অভাবে মানুষের মৃত্যুর খবর আমরা দেখতে পাই। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি শহরের চাকচিক্যময় জীবন তরুণ প্রজন্মকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে।
কিন্তু শহরমুখী এই জনস্রোত কেবল ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে না। এর ফলে শহরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ দ্রুত বাড়ছে। আবাসন সংকট, যানজট, পরিবেশ দূষণ, নিরাপদ পানির অভাব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। কর্মসংস্থানের আশায় শহরে এলেও অনেক মানুষ শেষ পর্যন্ত বস্তিতে বসবাস করতে বাধ্য হয়। ফলে যে স্বপ্ন নিয়ে তারা শহরে আসে, বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে সেই স্বপ্ন অনেক সময় ভেঙে পড়ে।
এর সমাধানে প্রয়োজন বিকেন্দ্রীকরণ। যদি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নত করা যায় এবং গ্রামেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়, তবেই এই জনস্রোত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। কল-কারখানাগুলো কেবল বড় শহরের আশেপাশে না রেখে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং এবং অনলাইন ব্যবসার সুযোগ গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তরুণরা ঘরে বসেই আয় করতে পারে। পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে যেন তারা উচ্চশিক্ষিত হতে পারে।
এর ফলে বাল্যবিবাহ ও কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে নারীসমাজ। পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যমে বেকারত্ব সমস্যাও হ্রাস পাবে। কৃষকরা যদি তাদের ফসলের সঠিক দাম পায় এবং গ্রামে হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র তৈরি হয়, তবে তারা শহরমুখী হওয়ার চিন্তা ছেড়ে নিজের ভিটাতেই সচ্ছল হতে পারবে।
আমার মতে, যদি ‘গ্রাম হবে শহর’ এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় তবে আমাদের শহরগুলোকে যেমন আমরা ঘনবসতিপূর্ণ হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারবো তেমনি গ্রামেই মানুষ মর্যাদার সাথে বসবাস করার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও হবে সুষম, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
লেখিকা: মাশরিফা মিশকাত
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।