নেওয়াজ শরিফ:
দরজার ওপাশে নীরবতা। দিনের পর দিন ফোন বেজে চলেছে,কেউ ধরছে না। প্রতিবেশীরা প্রথমে গুরুত্ব দেননি।পরে ঘর থেকে দুর্গন্ধ বের হলে দরজা ভেঙে দেখা গেল মানুষটি অনেক আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। সাম্প্রতি এমন ঘটনা দেশের বিভিন্ন স্থানে বারবার ঘটছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বহু দেশেই নিঃসঙ্গ মৃত্যু এখন এক উদ্বেগজনক সামাজিক বাস্তবতা। প্রশ্ন হচ্ছে—একটি পরিবারকেন্দ্রিক সমাজে কেন বাড়ছে এমন মৃত্যু? কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে পারিবারিক দায়বোধ?
বাংলাদেশের সমাজ দীর্ঘদিন ধরে পারিবার বান্ধন ও সামাজিক ঐক্যের জন্য পরিচিত ছিল। যৌথ পরিবারে দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, খালা-মামারা একই ছাদের নিচে কিংবা কাছাকাছি বসবাস করতেন। পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে তা দ্রুত সবার নজরে আসত। কিন্তু গত দুই দশকে নগরায়ন, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার ব্যস্ততা সেই কাঠামোকে বদলে দিয়েছে। পরিবার ছোট হয়েছে, দূরত্ব বেড়েছে, আর সম্পর্ক সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ফোনকল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খোঁজখবরে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, কর্মব্যস্ততা ও ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা। এর প্রভাবে পরিবার ধীরে ধীরে ভালোবাসা, মমতা ও আবেগের আশ্রয়স্থল থেকে দায়িত্ব পালনের একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত হচ্ছে। অনেক সন্তান নিয়মিত বাবা-মায়ের জন্য অর্থ পাঠান, কিন্তু তাঁদের নিঃসঙ্গতা, মানসিক কষ্ট কিংবা প্রতিদিনের অনুভূতির খবর রাখার সময় পান না। অথচ একজন প্রবীণ মানুষের জন্য শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আপনজনের সান্নিধ্য, আন্তরিক কথোপকথন, নিয়মিত খোঁজখবর এবং নিজের গুরুত্ব অনুভব করার সুযোগ।
তবে নিঃসঙ্গতার এই সংকট শুধু প্রবীণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একাকী বসবাসকারী তরুণ, অবিবাহিত ব্যক্তি, তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষ কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষেরাও ক্রমশ একই ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রযুক্তির এই যুগে যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কমেছে হৃদয়ের সংযোগ।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো প্রতিবেশী সংস্কৃতির ক্রমাবনতি। একসময় প্রতিবেশীরা ছিলেন নিকট আত্মীয়ের মতো; সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদে তাঁরা একে অপরের পাশে দাঁড়াতেন। কিন্তু নগরায়নের এই সময়ে একই ভবনে বছরের পর বছর বসবাস করেও অনেকেই পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দার নাম পর্যন্ত জানেন না। ব্যস্ততা ও আত্মকেন্দ্রিকতার বেড়াজালে মানুষ ক্রমশ নিজ নিজ পরিসরে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে একজন মানুষ কয়েক দিন ঘর থেকে বাহির না হলে, দরজা না খুললে কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়লেও তা অনেক সময় কারও নজরে আসে না। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই নিঃসঙ্গ মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোকে আরও সহজ করে তুলছে।
তবে এই সংকটের জন্য পুরোপুরি পরিবারকে দায়ী করলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়ালেই থেকে যায়। নিঃসঙ্গ মৃত্যুর পেছনে পারিবারিক দূরত্বের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রবীণবান্ধব সেবার সীমাবদ্ধতা এবং কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তা কাঠামোর অভাব গুরুত্বপূর্ণ। একাকী বসবাসকারী মানুষদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ এখনও পর্যাপ্ত নয়।
নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি কেবল অর্থনৈতিক সূচকে এগোচ্ছি? একটি সমাজের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে মাপা যায় না; মাপা হয় তার সবচেয়ে একাকী মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতায়।
লেখক: নেওয়াজ শরিফ,
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।