রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

পর্যটনের নামে লোকজ সংস্কৃতির কবর

রোববার, মার্চ ২৯, ২০২৬
পর্যটনের নামে লোকজ সংস্কৃতির কবর

তাসনিম জাহান খুশবু:

লোকজ সংস্কৃতি কোনো প্রদর্শনীর বস্তু নয়, কোনো উৎসবের মৌসুমি সাজও নয়। এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে গাঁথা এক জীবন্ত প্রবাহ—যেখানে আনন্দ আছে, বেদনা আছে, বিশ্বাস আছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে থাকা স্মৃতি আছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ এই লোকজ সংস্কৃতি পর্যটনের নামে ধীরে ধীরে তার প্রাণ হারাচ্ছে। উন্নয়নের আলোয় আলোকিত করার বদলে আমরা যেন নিজ হাতে কবর দিচ্ছি আমাদের শিকড়কে।

পর্যটন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি—সব দিক থেকেই পর্যটনের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে পর্যটনবান্ধব দেশ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাইছে। পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন ও গ্রাম—প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে এ দেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পর্যটন উন্নয়ন কি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে সম্মান করছে, নাকি তা ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে?

লোকজ সংস্কৃতি কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগের ফল নয়। এটি গড়ে উঠেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, বিশ্বাস, শ্রম ও আনন্দের মধ্য দিয়ে। বাউল গান ছিল আত্মসাধনার ভাষা, পালাগান ছিল সমাজের সুখ–দুঃখ বলার মাধ্যম, নকশিকাঁথা ছিল নারীর অনুভূতির নীরব প্রকাশ। এসব সংস্কৃতি জন্ম নিয়েছিল কোনো মঞ্চের আলোয় নয়, বরং খোলা আকাশের নিচে, মানুষের উঠোনে, নদীর ধারে, মাঠের পাশে।

কিন্তু পর্যটনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে লোকজ সংস্কৃতিকে আজ আলাদা করে “দেখানোর জিনিস” বানানো হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রে নির্দিষ্ট সময়সূচিতে লোকজ গান বা নৃত্য পরিবেশন করা হয়, যেখানে শিল্পীর জীবনবাস্তবতা বা দর্শনের কোনো জায়গা থাকে না। সংস্কৃতি তখন আর স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহের অংশ থাকে না, হয়ে ওঠে সাজানো প্রদর্শনী।

এই প্রক্রিয়ায় লোকজ শিল্পীর অবস্থানও বদলে যাচ্ছে। তিনি আর সমাজের প্রতিনিধি নন, বরং দর্শকের বিনোদনের মাধ্যম। পর্যটকদের রুচি অনুযায়ী গান বদলাতে হয়, পোশাক পাল্টাতে হয়, অনেক সময় ভাবধারার সঙ্গেও আপস করতে হয়। এতে লোকজ সংস্কৃতির গভীরতা হারিয়ে যায়, থাকে শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য।

পর্যটনের নামে সংস্কৃতির বিকৃতির পাশাপাশি ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্রামবাংলার নদীপাড়, হাওর বা পাহাড়ি অঞ্চল দখল করে গড়ে উঠছে রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। এসব স্থাপনা শুধু প্রকৃতির ক্ষতি করছে না, লোকজ সংস্কৃতির চর্চার স্বাভাবিক জায়গাগুলোকেও গ্রাস করছে। যেখানে একসময় বসতো গ্রাম্য আসর, সেখানে আজ ঢুকে পড়ছে কংক্রিট ও কৃত্রিম বিনোদন।

লোকজ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতা। শিশুরা বড়দের দেখে শিখত গান, গল্প, উৎসব। কিন্তু পর্যটননির্ভর সংস্কৃতিতে এই ধারাবাহিকতা ভেঙে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম লোকজ সংস্কৃতিকে জীবনের অংশ হিসেবে নয়, বরং অর্থ উপার্জন বা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে দেখতে শুরু করছে।

তবে পর্যটন সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়। পরিকল্পিত ও সংবেদনশীল পর্যটন লোকজ সংস্কৃতিকে টিকিয়েও রাখতে পারে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, সংস্কৃতির মৌলিক রূপ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা থাকলে পর্যটন লোকজ সংস্কৃতির সহায়ক শক্তি হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, লাভের অঙ্কটাই বড় হয়ে ওঠে।

লোকজ সংস্কৃতি কোনো অতীত নয়, এটি আমাদের চলমান পরিচয়। পর্যটনের নামে এই পরিচয়কে ধ্বংস করা মানে আত্মবিস্মৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া। উন্নয়ন যদি নিজের শিকড় কাটার নাম হয়, তবে সেই উন্নয়ন আমাদের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়—সে প্রশ্ন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

লেখক: তাসনিম জাহান খুশবু
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল