সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

টিকার ঘাটতিতে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে হাম; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জোর দিচ্ছে সরকার

সোমবার, মার্চ ৩০, ২০২৬
টিকার ঘাটতিতে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে হাম; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জোর দিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ১১ মাস বয়সি শিশু আব্দুর রহমানকে নিয়ে ঢাকার একাধিক হাসপাতালে এনআইসিইউয়ের জন্য ছুটাছুটির পর ১৫ মার্চ রাতে তাকে ভর্তি করা হয় পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে চারদিন চিকিৎসার পর ১৯ মার্চ মারা যায় সে। তার চিকিৎসক টিবিএসকে জানান, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।

আব্দুর রহমানের স্বজন মাসুম জানান, ৯ মাস বয়সে হামের টিকা পায়নি শিশুটি; সে সময় তার এলাকায় টিকা সংকট ছিলো। 

এর আগে ১৬ মার্চ সংক্রামক ব্যধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগী আইসিইউ না পেয়ে মারা যায়। এ ঘটনার পরদিন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে হাসপাতালটিতে আইসিইউ বেড চালু করা হয়। 

দেশে উদ্বেগজনকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা, এরইমধ্যে ঢাকায় একাধিক শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। হামের রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। গতকাল রাজশাহীতে তিন শিশু এবং ময়মনসিংহে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) বিঘ্ন, টিকার সংকট ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলনের কারণে সময়মতো হামের টিকা না পাওয়াই এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ। 

এর চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের হার অনেক বেশি। সাধারণত এই বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়ার সময় এখনো হয়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নতুন করে ইপিআইয়ের টিকা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডেডিকেটেড হাসপাতাল প্রস্তুত, আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বাড়ানো এবং বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালুর পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে।

টিকার ঘাটতি ও কর্মসূচির বিঘ্নে তৈরি হয়েছে ঝুঁকি

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) সিএসও কনস্টিটিউয়েন্সি স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারপারসন ড. নিজাম উদ্দিন টিবিএসকে বলেন, গত প্রায় এক বছর ধরে ইপিআইয়ের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 

'বিভিন্ন সময়ে ভ্যাকসিনের সরবরাহ ছিল না, আবার কর্মীদের আন্দোলনের কারণে মাঠপর্যায়ে টিকা ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। ফলে বহু শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে,' বলেন তিনি।

এছাড়া ইপিআই কর্মসূচিতে প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ পদ শূন্য থাকাও কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আরেকটি কারণ বলে জানান তিনি।

ড. নিজাম উদ্দিন বলেন, 'এর আগে যখনি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা দ্রুত মেজারমেন্টের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এবারের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বর্তমানে একাধিক টিকার সংকট রয়েছে, যার মধ্যে হামের টিকাও আছে। এর ফলে যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।'

তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। 'অতিদ্রুত মিজেলস ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন শুরু করতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেগুলোকে ঘিরে ফেলে সবাইকে টিকা দিতে হবে—সে আগে টিকা পেয়েছে কি না, সেটি বড় বিষয় নয়। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ডোজ দিতে হবে। ৯ মাসের আগেও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের বিশেষ পরিস্থিতিতে টিকা দেওয়া যেতে পারে।' 

ইপিআইয়ের আওতায় শিশুর ৯ মাস বয়সে এমএমআর-এর প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। 

সূত্রমতে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৫ম সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বের হয়ে আসার প্ল্যান করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ থাকায় ইপিআইয়ের টিকা কেনা হয়নি। ফলে ২০২৫ সালে দেশে ইপিআইয়ের টিকা সংকট দেখা দেয়। 

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে র‍্যাশ ওঠা এ রোগের প্রধান লক্ষণ। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রের ক্ষুদ্র জলকণা (রেসপিরেটরি ড্রপলেট) ও আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়।

তিনি বলেন, 'হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে বিশ্রাম, প্রচুর তরল খাবার গ্রহণ এবং প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে এর লক্ষণগুলো নিরাময় করা হয়।'

ড. কামরুজ্জামান আরও বলেন, সময়মতো হামের টিকা না নেওয়া ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার কারণে শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। 'পোস্ট-মিজলস নিউমোনিয়ার রোগী সামলাতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি এখন। ৬ মাস থেকে তিন বছর বয়সি রোগী বেশি পাচ্ছি আমরা।'

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। 

ইপিআইয়ের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ টিবিএসকে জানান, দেশে হামের সংক্রমণ এখন শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। 

'রাজশাহী, খুলনাসহ প্রায় সারা দেশেই এটি ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণত বসন্তকালে শুরু হওয়া এ ধরনের আউটব্রেক প্রায় দুই মাস স্থায়ী হতে পারে। ইতোমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। মৃত্যুর সঠিক তথ্য নেই এখনো আমাদের কাছে,' বলেন তিনি।

শাহরিয়ার সাজ্জাদ আরও বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যেই এখন বেশি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। অথচ এই বয়সে তাদের টিকা নেওয়ার কথা নয়। 'অর্থাৎ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে।'

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় 'আউটব্রেক রেসপন্স' হিসেবে আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে ব্যাপক রিভ্যাকসিনেশন চালানো হতে পারে—এমনকি আগে টিকা নেওয়া শিশুদেরও অতিরিক্ত ডোজ দেয়া হতে পারে বলে জানান তিনি। 

তিনি বলেন, 'টিকা না নেওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তাই অভিভাবকদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করতে হবে।' 

শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, টিকাদানের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করতে সোমবার ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমানে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি হামের রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে এখন ১৩০ জন রোগী ভর্তি আছে। অনেককেই করিডোর ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ হাসপাতালে হামে এক শিশুর মৃত্যুও ঘটেছে। এছাড়া শিশু হাসপাতাল ও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিশু ওয়ার্ডে হামের রোগীর চাপ অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

সরকারের পদক্ষেপ

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিবিএসকে জানান, দেশে হামের টিকার সংকট ছিল; এখনো এ সংকট আছে। 

তিনি বলেন, 'আউটব্রেক দেখা দেওয়ায় দ্রুত ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে টিকা কেনার অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত ভ্যাকসিন কিনে ভ্যাকসিনেশন শুরু করা হবে।' 

তিনি আরও জানান, সংক্রামক ব্যধি হাসপাতাল হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। হামের তথ্য নিবিড় মনিটরিংয়ে আছে। 

'এরপরে যদি প্রাদুর্ভাব আরও বাড়ে, তা সামাল দিতে ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল রেডি রাখা হয়েছে, মানিকগঞ্জে সাত বেডের একটা আইসিইউ রেডি রাখা হয়েছে।' 

হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটরের সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমাদের ভেন্টিলেটর মেশিন শর্টেজ ছিল। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনটা ভেন্টিলেটরের টাকা ম্যানেজ করেছি, তিনটা বা চারটা নতুন ভেন্টিলেটর মেশিন কেনা হবে নবজাতকদের জন্য। শিশু হাসপাতাল রেডি রাখা হয়েছে। এছাড়া ভ্যাকসিনের পক্ষে মানুষকে সচেতন করতে আমরা কাজ করবো।'

একে 


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল