জোবায়েদা জয়া:
আজকের বাংলাদেশে বেঁচে থাকা কোনো অধিকার নয়,বরং অন্যতম ঝুঁকি।সকালে বাসা থেকে বের হয়ে দিনশেষে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে আবার ফিরতে পারবেন কিনা তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। রাস্তায় নামা মাত্রই মৃত্যুভয়ের এক অদৃশ্য বেড়াজাল আমাদের ঘিরে রাখে। প্রতিটা পদে পদে মৃত্যু। এদেশে মানুষের জীবনের মূল্য সবচেয়ে সস্তা,কয়েক সেকেন্ড পর আপনি এই দুনিয়ার আলো দেখতে পারবেন কিনার তার নিশ্চয়তা নাই,অথচ আমরা কতরকমের রঙিন স্বপ্ন বুনি নিজেদের ঘিরে...
ধরুন, আপনি সকালে হাটতে বের হবেন, ছিনতাইকারী কিংবা দুর্বৃত্তরা আপনার কাছে থাকা অর্থসম্পদ সহ আপনার জীবন ধরেই টান দিবে। অফিসে যাওয়ার পথে হয়তো এক কাপ চা খেতে দাঁড়াবেন, কোথা থেকে জমের মত কোনো এক গাড়ি এসে আপনাকে চাপা দিয়ে চলে যাবে কিংবা মাথার উপরে বিয়ারিং প্যাড পড়েই আপনি স্পট ডেড। হোটেল কিংবা রেস্টুরেন্টে দুমুঠো খেতে যাবেন,আগুনে দ্বগ্ধ হয়ে লাশ হয়ে ফিরবেন। বিকালে প্রিয়জনদের নিয়ে রিকশায় ঘুরতে বের হবেন পেছন থেকে বাস কিংবা গাড়ি এসে আপনাকে হাসপাতালের বিছানায় পাঠিয়ে দিবে। দীর্ঘ কর্মদিবস শেষে বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে বাসে রওনা হবেন, বাস চালকদের নিজস্ব সংঘর্ষ আর বেপরোয়া গতির মাঝে পিষে যাবেন।ঈদে নাড়ির টানে ছুটে যাবেন, প্রিয়জনের কাছে পৌছানোর আগেই দুই লঞ্চের মাঝে পিষে মরবেন, নাহলে ট্রেন যাত্রায় প্রান হারিয়ে কাফনে মুড়ে একেবারে বাড়ি পৌছাবেন। যদিও না কোনোভাবে জীবিত পৌছে যান,ফেরার সময় প্রিয়জনের সাথে কখন যে শেষ বিদায় তা বুঝার আগেই নিজের অজান্তেই হয়তো দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে কবরে পৌছে যাবেন। এমনকি যদি ভাবেন রাতে নিজের বাসায় নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন, চোর ডাকাত এসে আপনার শান্তির ঘুম তো কেড়ে নিবেই সেই সাথে আপনার সহায় সম্বল অর্থ সম্পদ এমনকি আপনার জীবন ও কেড়ে নিবে। এধরনের অপমৃত্যু বা নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের নিত্যকার জীবনের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিনত হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে নির্মম এবং যন্ত্রনাদায়ক ব্যাপার হচ্ছে আপনি যেভাবেই মরেন না কেন এর কোনো বিচার নাই। রাষ্ট্র লাশ গোনায় অভ্যস্ত, মানুষ গোনায় নয়। আপনি মরবেন, রাষ্ট্র শোক প্রকাশ করবে, ফাইল খুলবে, কমিটি গঠন করবে,জনগণ আর সরকার একে অপরকে দোষারোপ করবে কিন্তু বিচার আর হবে না।হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আর জীবন ফিরে পাবে না। এদেশে পাখির মত মানুষ মারা হয়; হয় অব্যবস্থাপনায়, নাহয় সচেতনতার অভাবে, নাহয় সিন্ডিকেটের যাতাকলে পিষে মরে। কাকে দায় দিবেন আপনি? দায় দিলেও কেউ সেই দায়ভার নিতেই বা চাইবে কেন? কারন আমরা করাপশন আর একে অন্যকে দোষারোপে অভ্যস্ত এক নির্লজ্জ সুশীল জাতি।
আমাদের একজন হাদি ছিলো। যে কিনা চিরকাল চুপ করে থাকা বাংলাদেশকে কথা বলতে শিখিয়েছিল, অন্যায় কে 'অন্যায়' আর অধিকারকে নির্ভয়ে 'অধিকার' বলতে সাহস দিয়েছিলো।বেশ কিছুদিন আগে তার বজ্রকন্ঠ কেড়ে নেওয়া হলো,প্রকাশ্যে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, আমার ভাইয়ের কথা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হলো আজ তার আটানব্বই দিন। বিচার কোথায়?
দীপু চন্দ্র দাস,নামক এক শ্রমিককে কিছুদিন আগে মব করে জনসমক্ষে পিটিয়ে তারপর পুড়িয়ে মেরে হত্যা নিশ্চিত করা হয়।এই হত্যার বিচার কোথায়?
ফার্মগেটে মেট্রোরেলের রিয়ারিং প্যাড খুলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীর মৃত্যু।আমাদের জানের নিরপত্তার কোথায়?এ মৃত্যুর দায় কার? বিচার কোথায়?
কিছুদিন আগে বাঘেরহাটের রামপালে নবদম্পতি নিয়ে বরযাত্রী বাড়ি ফেরার আগেই নৌবাহিনীর বাস এবং মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই পরিবারের অন্তত ১৩জন লাশ হয়ে ফিরলো। কয়েক ঘণ্টা আগেও যাদের দাম্পত্য জীবনে শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার চুক্তি হয়েছে,অথচ বিয়ের সেই লাল শাড়ীতেই হলো শেষ বিদায়।আনন্দঘন পরিবেশ মুহুর্তেই রূপ নিলো শোকের কান্নায়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গত ১৭ মাসে বাংলাদেশে মব সহিংসতা বা গণপিটুনিতে ২৫৯ জন এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৯৫ জন নিহত হয়েছেন। এদের কেউ ই কি তাদের হত্যার বিচার পেয়েছে?
চলতি বছরের ঈদ যাত্রায় মাত্র ৮দিনে সড়ক, নৌ ও রেলপথে দুর্ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন নিহত এবং ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এরপরও সরকার বলছে নিরাপদ যাত্রা হয়েছে এই ঈদে।
অথচ ২দিন আগেও লঞ্চের ও ট্রলারের সংঘর্ষে চাপা পড়ে মুহুর্তেই ঝড়ে গেলো তাজা প্রান। ঈদে স্ত্রী, অনাগত সন্তান আর পরিবারের সকলে মিলে হাসি-আড্ডায় যার ঈদে আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিলো,মুহুর্তেই তা রূপ নিলো কান্নার রোলে। জীবন কত অনিশ্চিত তাই-না?
গতকাল ঈদশেষে বাড়ি ফেরার পথে দৌলতিয়া ঘাটে ফেরি পারাপারের সময় যাত্রীবাহী বাস উল্টে নদীতে পড়ে প্রান হারায় প্রায় অর্ধ-শতাধিক মানুষ।এই মানুষগুলোর দোষ কি ছিলো?তারা হয়তো জানতো ও না যে এই বিদায় ই পরিবারের সাথে শেষ বিদায়।যতদূর যায় শোনা যায় শুধু নিহতদের প্রিয়জনদের আহাজারি আর ক্রন্দনের সুর।আমাদের দেশে প্রায় প্রতিদিনই কুরবানীর ঈদ। বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে, হাটে, ঘাটে,মাঠে পথে- প্রান্তরে আমরা নিজেদের জবাই করে ঈদ উদযাপন করি।
এদেশে মৃত্যু আসলে পানির দরের চেয়েও কম দরে বিক্রি হয়,আর আমরা তার অনিচ্ছুক ক্রেতা। মৃত্যু এখন এতটাই সহজ যে অপমৃত্যু দেখতে দেখতে আমরা আজ পাথরের মতন হয়ে গেছি।এখন আর মৃত্যু সংবাদে তেমন অবাক হইনা। মৃত্যু কতটা সহজলভ্য এই দেশে!এদেশে আজ হত্যা আর অপমৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে।আমরা রাস্তাঘাটে দূর্ঘটনায় মরি,অব্যবস্থাপনায় পিষ্ট হয়ে মরি,পানিতে ডুবে মরি,হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় বা চিকিৎসার অভাবে মরি,সিন্ডিকেটের বেড়াজালে পিষ্ঠ হয়ে মরি,নিত্যদিন ভেজাল খেয়ে মরি,একাত্তর কিংবা চব্বিশের চেতনার যাতাকলে পরে মরি,তবে স্থলে,জলে, আকাশে সবখানে নিজের রক্তের ছাপ রেখে যেতে ভুলি না। ক্রমাগত মানুষ মরছে, কারণ মানুষ মরলে রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না। আমাদের টনক নড়ে না,হুশ ফেরে না। আর লাশের উপর দাঁড়িয়ে থেকে রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রযন্ত্র চালিয়ে যায়।
লেখক: জোবায়েদা জয়া
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।