ওম্মে হাবিবা তৃষা:
বর্তমান নগরজীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো যানজট। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের রাস্তাগুলো যেন স্থবির হয়ে থাকে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী—সবাইকে প্রতিনিয়ত এই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো এখন আর স্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং এক ধরনের দৈনন্দিন সংগ্রাম। তবে যানজট শুধু সময়ের অপচয়ই নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাই এই সমস্যার গভীরতা বোঝা এবং কার্যকর সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার পিক আওয়ারে যানবাহনের গড় গতি মাত্র ৯ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা, যা অনেক ক্ষেত্রে সাইকেলের গতির কাছাকাছি। অফ-পিক সময়েও এই গতি খুব বেশি নয়, প্রায় ২২ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। একটি রাজধানী শহরের জন্য এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত হতাশাজনক। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঢাকায় একজন মানুষের একমুখী যাতায়াতে গড়ে ৬০ মিনিটেরও বেশি সময় লাগে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় শুধু রাস্তায় কাটছে, যা মানুষের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং ব্যক্তিগত জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে।
যানজটের অর্থনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত গুরুতর। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার যানজটের কারণে দেশের প্রায় ২.৯ শতাংশ জিডিপি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরোক্ষভাবে এই ক্ষতির পরিমাণ ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। শুধু একটি ২৬ কিলোমিটার সড়কেই মাসে ২২৫ কোটির বেশি টাকার ক্ষতি হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এতে বোঝা যায়, যানজট শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
সামাজিক ও মানবিক দিক থেকেও যানজটের প্রভাব কম নয়। একটি জরিপে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার কারণে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়, মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হয়। একইভাবে কর্মজীবী মানুষদের ক্ষেত্রেও কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যানবাহনে বসে থাকার ফলে বিরক্তি, হতাশা এবং মানসিক অবসাদ তৈরি হয়। পাশাপাশি যানজট বায়ু দূষণ ও শব্দ দূষণ বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো—এই সমস্যার মূল কারণগুলো কী?
প্রথমত, দ্রুত নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সড়কের ওপর চাপ অনেক বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সরু রাস্তা এবং অপর্যাপ্ত সড়ক ব্যবস্থা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ।
দ্বিতীয়ত, গণপরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে। বাসগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়মিত চলাচল এবং নিরাপত্তাহীন পরিবেশ সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করে। ফলে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, যা যানজটকে আরও তীব্র করছে।
তৃতীয়ত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় না এবং চালকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যেখানে সেখানে থামা এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা যানজট বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া অবৈধ পার্কিং এবং ফুটপাত দখলও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
এই জটিল সমস্যার সমাধানও বহুমুখী হতে হবে-
প্রথমত, একটি আধুনিক ও কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। মেট্রোরেল, বিআরটি এবং রেলব্যবস্থা সম্প্রসারণ করলে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাবে। গণপরিবহনকে আরামদায়ক, নিরাপদ এবং সময়ানুবর্তী করতে হবে, যাতে মানুষ স্বেচ্ছায় তা ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়।
দ্বিতীয়ত, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী রাস্তা প্রশস্ত করা, নতুন সড়ক নির্মাণ, ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে হবে, যাতে পথচারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারে এবং সড়কের ওপর চাপ কমে।
তৃতীয়ত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ নিজে থেকেই নিয়ম মেনে চলে এবং দায়িত্বশীল আচরণ করে। চতুর্থত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম, ডিজিটাল সিগন্যাল এবং সিসিটিভির মাধ্যমে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অনেকাংশে যানজট কমানো সম্ভব। রিয়েল-টাইম ট্রাফিক তথ্য মানুষকে বিকল্প পথ বেছে নিতে সাহায্য করতে পারে।
সবশেষে, আমাদের ব্যক্তিগত মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার করা, ছোট দূরত্বে হাঁটা বা সাইকেল চালানো এবং কারপুলিংয়ের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমবে এবং যানজটও হ্রাস পাবে।
যানজট একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল সমস্যা, যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর উদ্যোগ এবং সবার সম্মিলিত সচেতনতা থাকলে এই সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। একটি গতিশীল, আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে হলে এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে যানজট আমাদের উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা হিসেবেই থেকে যাবে।
লেখক: ওম্মে হাবিবা তৃষা
দর্শন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।