আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীরা একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির বড় লক্ষ্য থেকে সরে এসেছেন। এর পরিবর্তে তারা সংঘাত এড়াতে আপাতত একটি সাময়িক সমঝোতাপত্র তৈরির চেষ্টা করছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ইরানের দুটি সূত্র।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা অমীমাংসিতভাবে শেষ হওয়ার পর এই কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, বিশেষ করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং কতদিন পর্যন্ত তেহরান তাদের পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ রাখবে—এসব বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তা এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনার অগ্রগতির বিষয়ে ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখাচ্ছেন।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট 'হরমুজ প্রণালি' পরিচালনার বিষয়ে দুই পক্ষ মতপার্থক্য কমিয়ে আনতে শুরু করেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে এই রুটটি অধিকাংশ জাহাজের জন্য বন্ধ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান চায় এই সমঝোতার মাধ্যমে ওয়াশিংটন তাদের জব্দকৃত কিছু তহবিল ছেড়ে দিক, যার বিনিময়ে তেহরান প্রণালিটি দিয়ে আরও বেশি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে।
তেহরানের পক্ষ থেকে ব্রিফ করা হয়েছে এমন একটি সূত্র বুধবার জানায়, একটি টেকসই চুক্তি সম্পন্ন হলে ইরান হরমুজ প্রণালির ওমান অংশ দিয়ে কোনো প্রকার হামলার ঝুঁকি ছাড়াই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে পারে—এমন একটি প্রস্তাব দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা চাচ্ছে।
তবে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অর্ধেকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বড় ধরনের বিভেদগুলো এখনো রয়ে গেছে। ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের (এইচইইউ) মজুত এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ পরমাণু কার্যক্রম কতদিন বন্ধ থাকবে, তা নিয়ে ঐকমত্য হওয়া এখনও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সরিয়ে ফেলুক।
ইরান দীর্ঘ দিন ধরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের স্বীকৃতি দাবি করে আসছে। তেহরানের দাবি, তাদের এই কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। তবে পশ্চিমা শক্তি ও ইসরায়েলের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্যেই এই কাজ করছে।
একজন পশ্চিমা কূটনীতিক এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, পরমাণু ইস্যুটি এখনো একটি মূল বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, যদি সংঘাত বন্ধে কোনো সমঝোতা অর্জিত হয়, তবে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনার জন্য দুই পক্ষ ৬০ দিন সময় পাবে। এই প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র সম্পৃক্ততার প্রয়োজন হবে। এর আগে ২০১৫ সালে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম সীমিত করার বিপরীতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা সম্পন্ন করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। তবে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি বাতিল করেন।
সূত্রগুলো আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে ইরান যেন আগামী ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখে, যেখানে ইরান এই সময়সীমা ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। এছাড়া তেহরান জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহারের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও দাবি করছে।
এর আগে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পুরো মজুত দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার মার্কিন দাবি নাকচ করেছিল ইরান। উল্লেখ্য, বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে এই সমৃদ্ধকরণ মাত্রা অনেক বেশি। তবে বর্তমানে সমঝোতার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান তাদের সমস্ত উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠাতে রাজি না হলেও, এর একটি অংশ কোনো তৃতীয় দেশে পাঠাতে পারে।
ওই সূত্রের দাবি, চিকিৎসার প্রয়োজনে এবং তেহরানের একটি গবেষণা চুল্লি চালানোর জন্য কিছু পরিমাণ ইউরেনিয়াম (২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ) তাদের নিজেদের কাছে রাখা প্রয়োজন।
আইএইএ-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের পরমাণু স্থাপনায় প্রথম হামলা চালায়, তখন তেহরানের কাছে ৪৪০.৯ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ (৬০%) ইউরেনিয়াম ছিল। তবে সেই হামলার পর বর্তমানে ঠিক কতটুকু মজুত অবশিষ্ট আছে, তা এখনো অস্পষ্ট।
আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি গত মার্চ মাসে জানিয়েছিলেন, অবশিষ্ট মজুতের 'অধিকাংশই' ইসফাহানের একটি সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সে সংরক্ষিত আছে এবং তাদের ধারণা সেখানে ২০০ কেজির কিছু বেশি ইউরেনিয়াম রয়েছে। এছাড়া নাতাঞ্জ পরমাণু কমপ্লেক্সেও কিছু মজুত থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন ৪৪০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো উদ্বেগের কারণ। কারণ এটি ইরানকে খুব দ্রুত বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা দিবে, যেহেতু সমৃদ্ধকরণের চূড়ান্ত পর্যায়টি তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়।
এমআই