শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকার হারানো সিনেমা হল

শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬
ঢাকার হারানো সিনেমা হল

আরমীন আমীন ঐশী:

যেখানে একদিন ছিল হাসির গুঞ্জন,করতালির ধ্বনি আর রূপালি পর্দায় জীবনের গল্প আজ সেখানে পড়ে আছে ধূলিধূসর ইট কাঠের স্মৃতিচিহ্ন।

একসময় ঢাকা শহরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সিনেমা হলগুলো ছিল রাতের আকাশের জ্বলজ্বলে তারা।সে সময় সিনেমা দেখতে যাওয়াটা ছিল উৎসবের মতো।নতুন জামা পরে পরিবার সহ সিনেমা হলে যাওয়া ছিল মধ্যবিত্ত জীবনের অন্যতম আনন্দ। 
আজ সেই তারা ভরদুপুরেই নিভে গেছে।সিনেমা হলগুলো যেন পুরনো বইয়ের পৃষ্ঠার মতো হয়ে গেছে,যার গন্ধে এখনও স্মৃতিরা জেগে ওঠে কিন্তু আর পড়া হয়না।মুক্তি, গ্লোব,বলাকা,চিত্রা,রাজমনী এই নামগুলো এখন আর কোনো শো টাইম ঘোষণা করেনা বরং তারা এখন স্থাপত্যের কলঙ্ক হয়ে শহরের কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদে।সিনেমা হলগুলো ছিল ঢাকার সাংস্কৃতিক হৃদস্পন্দন,আজ তার অনেকগুলোই পরিণত হয়েছে শপিং মলে,গাড়ির গ্যারেজে কিংবা ধ্বংসস্তুপে।

বাংলাদেশে সিনেমা হলের ইতিহাস অনেক পুরনো। ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত ঢাকার প্রথম সিনেমা হল পিকচার হাউজ যা পরে শাবিস্তান হলে রুপান্তরিত হয়। এরপর ধীরে ধীরে রমনা, পল্টন, পুরান ঢাকা,নিউ মার্কেট এইসব এলাকায় গড়ে উঠতে থাকে আধুনিক সিনেমা হল। প্রতিটি হলের নিজস্ব ইতিহাস ছিল,ছিল দর্শক টানার আলাদা বৈশিষ্ট্য। কোনোটি ছিল পারিবারিক বিনোদনের জন্য আদর্শ আবার কোনোটি ছিল সামাজিক সচেতনতামূলক সিনেমার প্লাটফর্ম।

বহু পরিবারের পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতো সিনেমা হল ভ্রমণ। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলে হলে লাইন লেগে যেত,পোস্টারে মুখর হয়ে উঠত রাস্তার মোড়।

সত্তর আশির দশকের  সিনেমা শিল্পের সোনালি যুগে ঢাকার প্রায় প্রতিটি বড় বড় এলাকায় একটি বা একাধিক সিনেমা হল ছিল।সেই সময় এই হলগুলো শুধু বাংলায় নয় হিন্দি ও ইংরেজি সিনেমাও দেখাতো। এই বহুবিধতা ঢাকার নাগরিকদের মধ্যে এক বিশেষ রুচিবোধ গড়ে তুলেছিল,যা আজকের ডিজিটাল বিনোদনের মাধ্যমের যুগে অনেকাংশেই অনুপস্থিত। 

একসময় ঢাকায় সক্রিয় সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ১০০ এরও বেশি।কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে এই সংখ্যা কমতে থাকে।২০২০ সালের মধ্যে ঢাকায় সক্রিয় সিনেমা হল ছিল মাত্র ৩০ টি,এর মধ্যে অনেকগুলোর অবস্থাও ছিল করুণ।২০২৫ সালে এ সংখ্যা আরও কমেছে মুক্তি, শতাব্দী, রাজিয়া, গ্লোব,উত্তরা এসব নাম কেবল স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে।

একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে,১৯৯০ সালে বাংলাদেশে সক্রিয় সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ১২০০ এর বেশি।২০২৪ সালে এসে সে সংখ্যা ৩০০ এর নিচে নেমে এসেছে।

সময় বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই হলগুলো যেন সময়ের সাথে তাল মেলাতে পারেনি।মানুষ এখন সিনেমা দেখতে হলে যায় না কারণ ঘরে বসেই তারা মোবাইল কিংবা টিভির স্ক্রিনে হাজারো সিনেমা দেখে ফেলতে পারে। ওটিটি প্লাটফর্মের রাজত্বে সিনেমা হল অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।এর পাশাপাশি আমাদের দেশের সিনেমার মান  আশানুরূপ না হওয়ায় দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।অনেকেই বলেন,এখনকার সিনেমায় গল্প,সৃজনশীলতার গভীরতা নেই যার ফলে হলের সিটগুলো খালি থাকে আর ধীরে ধীরে হলগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

এই সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো বাণিজ্যিক লোভ।যেসব জায়গায় আগে সিনেমা হল ছিল সেসব জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন, শপিংমল কমপ্লেক্স ও অফিস। 

সিনেমা হল চালিয়ে যে আয় হয় তার চেয়ে অনেক বেশি লাভ হচ্ছে জমি বিক্রি করে আর বাড়ি ভাড়া দিয়ে।এসব কারণেই ঢাকার সিনেমা হলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে বসেছে।

তবে এখনও সব আশা শেষ হয়ে যায়নি। যদি সদিচ্ছা থাকে, আর সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়া যায় তাহলে ঢাকার সিনেমা হলগুলোতে আবারও প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এক সময় যেভাবে মানুষ পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে হলে গিয়ে সিনেমা দেখত, সেই অভ্যাসটা আবারও ফিরিয়ে আনা যাবে, দর্শকদের ভালো সিনেমা দেওয়া যায়।

ভালো সিনেমা মানে শুধু তারকার ঝলক নয়, সেখানে থাকতে হবে একটা গল্প, যেটা ছুঁয়ে যাবে দর্শকদের  হৃদয়কে। থাকতে হবে আবেগ, বাস্তবতা, আর এমন কিছু যা দর্শক নিজেকে খুঁজে পেতে পারে। মানুষ এখনো গল্প ভালোবাসে, শুধু দরকার সেই গল্পটা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার।
সিনেমার মানের পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে হলে বসার পরিবেশকেও।এসি, আরামদায়ক চেয়ার, উন্নত মানের সাউন্ড সিস্টেম আর বড় পর্দায় ভালো ছবি দেখার অভিজ্ঞতা যদি নিশ্চিত করা যায় তাহলে দর্শক নিশ্চিন্তে ও আনন্দ নিয়ে হলে আসবে।

এর পাশাপাশি সরকার হল মালিকদের জন্য প্রণোদনা, কর ছাড়, আর সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে তারা নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। 

সিনেমা হল একটি শহরের স্মৃতি ঘর।ঢাকার সিনেমা হলগুলোর মৃত্যু মানে আমাদের অতীত, গল্প ও অনুভব হারিয়ে যাওয়া।প্রজন্মের পর প্রজন্ম একসাথে বসে,অচেনা মানুষের সাথে অন্ধকার হলে কখনো হেসেছে,কখনো কেঁদেছে, কখনো বা হাততালি দিয়েছে।

আমাদের উচিত এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে নস্টালজিয়া হিসেবে না রেখে এটিকে আবার ফিরিয়ে আনা।এজন্য দরকার সরকার,চলচ্চিত্র নির্মাতা ও দর্শক সবাইকে একসাথে কাজ করা।আমরা যদি সত্যিই চাই তাহলে আবার ঢাকার সন্ধ্যায় ভীড় জমে টিকিট কেটে সিনেমা দেখতে যাওয়ার।সিনেমা হল ফরে পাবে পাবে হারানো আলো আর শহর ফিরে পাবে হারানো প্রাণ।

লেখক: আরমীন আমীন ঐশী 
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা।


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল