লাইফস্টাইল ডেস্ক:
ভিটা সারা ব্লেখনারের জীবন বদলে যায় এক শনিবার বিকালে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ওশেনসাইডে নিজের বাসায় থাকা অবস্থায় হঠাৎ তীব্র পিঠব্যথা অনুভব করেন এই মিডল স্কুলের গ্রন্থাগারিক। অ্যাসিড রিফ্লাক্সের ওষুধে কাজ না হওয়ায় স্বামীর পরামর্শে হাসপাতালে যান তিনি।
তারিখটি ছিল ৭ মার্চ, ২০২০—ঠিক কয়েকদিন পরই কোভিড-১৯ মহামারিতে নিউইয়র্কের হাসপাতালগুলো কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তার অগ্ন্যাশয়ে (প্যানক্রিয়াসে) একটি টিউমার রয়েছে।
‘তারা বলল, আমার প্যানক্রিয়াসে টিউমার আছে। আমি বললাম, না, এটা হতে পারে না। আমি মদ খাই না, ধূমপান করি না, সুস্থ জীবনযাপন করি’—স্মৃতিচারণ করেন ব্লেখনার।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার অত্যন্ত মারাত্মক। রোগ নির্ণয়ের এক বছরের মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ রোগী বেঁচে থাকেন, আর দুই বছর টিকে থাকেন মাত্র ১০ শতাংশ।
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই ব্লেখনার ও তার পরিবার চিকিৎসার পথ খুঁজতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তারা বেছে নেন নতুন এক পদ্ধতি—এমআরএনএ ভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন।
এমআরএনএ প্রযুক্তি: নতুন দিগন্ত
এমআরএনএ বা মেসেঞ্জার আরএনএ হলো এমন একটি অণু, যা ডিএনএ থেকে তথ্য বহন করে শরীরে প্রোটিন তৈরিতে সহায়তা করে। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনে ব্যবহারের কারণে এই প্রযুক্তি পরিচিত হলেও, এর আগে থেকেই ক্যানসার চিকিৎসায় এর সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছিল।
জার্মান প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেক, যারা ফাইজারের সঙ্গে কোভিড ভ্যাকসিন তৈরি করে, তারা প্রায় এক দশক ধরে ক্যানসার ভ্যাকসিন উন্নয়নে কাজ করে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক গবেষণায় ইতিবাচক ফল মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে নতুন ক্যানসার ভ্যাকসিন উন্নয়নে ২০০ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।
ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন
ব্লেখনার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টার। সেখানে ডা. ভিনোদ বালাচন্দ্রনের নেতৃত্বে শুরু হয় একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা।
ক্যানসারের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন তৈরি করা কঠিন, কারণ এটি শরীরের নিজস্ব কোষ থেকেই তৈরি হয়। তাই প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা ভ্যাকসিন তৈরি করতে হয়।
ব্লেখনারের শরীর থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা হয়। পরে সেটি গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করে জার্মানিতে পাঠানো হয়, যেখানে তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয় ব্যক্তিগত এমআরএনএ ভ্যাকসিন।
দুই মাসের মধ্যেই ভ্যাকসিন প্রস্তুত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসে। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে তাকে নিয়মিত এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। পাশাপাশি দেওয়া হয় ইমিউনোথেরাপি।
তবে কেমোথেরাপি তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়।
‘আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ওজন কমে ৯০ পাউন্ডে নেমে আসে, খেতে পারতাম না, সবসময় বমিভাব থাকত, লিভারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়,’—বলেন তিনি।
আশার গল্প
চিকিৎসার দীর্ঘ ছয় বছর পর ব্লেখনার এখন সুস্থ এবং তার শরীরে ক্যানসারের কোনো লক্ষণ নেই।
শুধু তিনিই নন, এই গবেষণায় অংশ নেওয়া ১৬ জন রোগীর মধ্যে ৮ জনের শরীরে শক্তিশালী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তাদের মধ্যে ৭ জন ছয় বছর পরও সুস্থ আছেন।
গবেষকরা বলছেন, এই সাফল্য ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ ভ্যাকসিন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
সূত্র: সিএনএন
একে