লাবনী আক্তার শিমলা:
একজন আফ্রিকান শিশুর মন কেন বিশ্বাস করে সাদা বর্ণ মানে সে তার চেয়ে উত্তম? একজন বাঙালি ঘরেই জন্ম নেওয়া শিশু কেন কষ্ট পায় তাকে কেউ কালো বললে? অথবা কেন সুন্দর ত্বক বলতে বোঝানো হয়, ফর্সা ধবধবে গায়ের রং? এসব প্রশ্নের উত্তর কি নিছক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, নাকি এর পেছনে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে আরও ভয়ানক কিছু?
ইতিহাসের পাতায় আজ রাজা-রানির যুগ শেষ হলেও ক্ষমতার পালাবদলে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে যায়নি সাম্রাজ্যবাদের কালো ছায়া। এই সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম প্রধান দুটি অস্ত্র হলো ঔপনিবেশিকতা ও বর্ণবাদ। এরা মূলত মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরির এক ধরনের ভাইরাস, যা মানুষের মাঝে আজ এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে চোখের সামনে সমস্ত স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও অন্ধত্বের ঠুলি পড়ে আছে। এই বিভেদ শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং একটি পরিবারের ভিত ভেঙে দেয়, দেশের বৈষম্যের মাত্রা বৃদ্ধি করে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনৈতিকতা সৃষ্টি করে। যদি এই সমস্যাটিকে একটি অবমূল্যায়িত সমস্যা বলা হয়, তবে ভুল হবে না। কারণ বিশ্ব যখন ছুটছে মুদ্রাস্ফীতি ও প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকে, তখন নীরবে দানবের মতো শক্তপোক্ত হচ্ছে ঔপনিবেশিকতা ও বর্ণবাদ।
শুরুটা সম্ভবত ১৫শ শতকে। পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, ডাচ, ফরাসি, জার্মান, বেলজিয়ান—এই ইউরোপীয় শক্তিগুলো আবিষ্কারের নামে একটি মাস্টারপ্ল্যান অভিযান চালায়। আফ্রিকান মানুষকে বানানো হলো পণ্য। ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ক্যারিবীয়ান, দক্ষিণ আমেরিকার সম্পদ লুটপাট করে নিজেদের উদরপূর্তির বিশাল আয়োজনে মেতে উঠল তারা। ১৫২৫ থেকে ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২.৫ মিলিয়ন আফ্রিকানকে জোরপূর্বক জাহাজে ভরে আমেরিকায় পাঠানো হয়। পথেই মারা যায় ১.৮ মিলিয়ন মানুষ। যারা বেঁচে থাকতো, তাদের কিনে নেওয়া হতো পশুর মতো। চাবুক, ধর্ষণ, অনামি কবর—এসব ছিল তাদের জীবনের দৈনন্দিন বাস্তবতা।
ক্রীতদাস বাণিজ্যের পর ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকাকে পুরোপুরি গ্রাস করার ষড়যন্ত্র করেছিল। সেই ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন কনফারেন্স।
ইউরোপের ১৪টি দেশের প্রতিনিধিরা বার্লিনে বসে আফ্রিকাকে টুকরো টুকরো করে বিলিয়ে দেয়। আফ্রিকার কোনো রাজা, সর্দার বা প্রতিনিধি সেখানে ছিল না। এই কনফারেন্স ছিল বর্ণবাদের লিখিত সনদ—যেখানে ঘোষণা করা হয়, শ্বেতাঙ্গদের কর্তব্য অসভ্য কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি মানুষদের সভ্য করা। ‘সাদা মানুষের বোঝা’ নামক এই প্রত্যয় বাস্তবে ছিল লুটের ডাক, গণহত্যার লাইসেন্স ও সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের সনদ। এই কনফারেন্সের পরেই আফ্রিকার ৯০ শতাংশ ভূখণ্ড ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির দখলে চলে যায়—সেখানে আগে ছিল স্বাধীন রাজ্য, সাম্রাজ্য ও সভ্যতা।
ব্রিটিশরা ভারত শাসন করেছে ২০০ বছর। দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত এবং আধুনিক গবেষক যেমন উৎসা পট্টনায়কের মতে, ভারত থেকে ব্রিটেনে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পাচার করা হয়েছে। বাংলার নীলচাষি, বিহারের কৃষক, পাঞ্জাবের শ্রমিক—সবার ঘামের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে লন্ডনের ব্যাংক ও ম্যানচেস্টারের কলকারখানা। ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষে ব্রিটিশ উদাসীনতায় মারা যায় ৩০ লাখ মানুষ। অথচ তখন লন্ডনের খাদ্যের মজুত ছিল প্রচুর।
১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত কঙ্গো ছিল বেলজিয়ামের রাজার ব্যক্তিগত খামারবাড়ি। রাবার সংগ্রহের নামে কেটে নেওয়া হতো হাত। পুরুষদের জিম্মি রাখা হতো তাদের স্ত্রী-সন্তানদের সামনে। কাজ না করলে পরিবারকে হত্যা করা হতো। প্রায় ১ কোটি কঙ্গোলীয় মারা যায় এই শাসনে। আর বিনিময়ে লিওপোল্ড পেয়েছিলেন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার (যা আজকের মূল্যে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার)।
এই রক্তাক্ত ইতিহাস এখনো থেমে নেই। নাইজেরিয়ায় তেল থাকার কারণে আজও বিদেশি কোম্পানিরা সেখানকার গভীর সমুদ্র লুট করছে। অথচ নাইজেরিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠী দিনে গড়ে দুই ডলার আয় করে। কঙ্গোতে কোবাল্ট খনিতে শিশুশ্রম হচ্ছে—আপনার আমার স্মার্টফোনের ব্যাটারি তৈরির জন্য।
NAACP-এর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে কারাবন্দি জনসংখ্যার অন্তত ৪০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ। FRA-এর মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রোমা সম্প্রদায়ের ৮০ শতাংশ মৌলিক চাহিদার নিচে বাস করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোতে মাথাপিছু জিডিপি এখনও ইউরোপীয় দেশগুলোর ১/২০ ভাগের কম—অথচ আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য ট্রিলিয়ন ডলার।
অলাউদাহ ইকুইয়ানো, যিনি ১৮শ শতকে নাইজেরিয়া হতে অপহৃত হন। পরবর্তীতে আমেরিকায় দাস হয়ে অনেকদিন থাকার পর ইংল্যান্ডে এসে তিনি মুক্ত মানুষ হতে পারেন। তাঁর আত্মজীবনী পড়লে তাঁর এই পণ্য থেকে মানুষ হওয়ার যাত্রা সম্পর্কে জানা যায়। তিনি লিখেছেন, "আমার নাম কেড়ে নেওয়া হলো, আমার ভাষা কেড়ে নেওয়া হলো, আমার দেবতাকে কটূক্তি করা হলো। এরপরেও তারা আশা করে আমি গ্রেট ব্রিটেনের রাজার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব!"
ক্ষুদ্র আগ্রাসন, পদ্ধতিগত কুসংস্কার, নীরব বৈষম্যে এই চাবুকের নির্যাতন বদলেছে। ফ্রান্সে পুলিশি নির্যাতনে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কিশোরদের মৃত্যু, ইতালিতে আফ্রিকান অভিবাসীদের খামারের জমিতে দিনমজুর বানিয়ে রাখা, সৌদি আরবে কাফালা ব্যবস্থায় দক্ষিণ এশীয় ও আফ্রিকান কর্মীদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া—এগুলো ঔপনিবেশিকতার আধুনিক সংস্করণ।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ যে উন্নয়ন মডেল প্রচার করে, তার অনেকটাই ঔপনিবেশিক মানসিকতার আদলে তৈরি। ১৯৮০-এর দশকে, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় ঋণ পরিশোধের নামে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বাজেট বাতিল করে ফেলা হয়। এর ফলে আজও নাইজেরিয়ায় অর্ধেক জনসংখ্যা বিদ্যুৎহীন। কারণ ঔপনিবেশিক প্রশাসন কখনো জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়েনি, তারা শুধু সম্পদ আহরণের অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত ছিল।
অক্সফোর্ড ২০২১-এর একটি গবেষণায় দেখা যায়, যে দেশে বর্ণবাদী বৈষম্য বেশি, সেদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীর গতিতে হয়। কেননা, বৈষম্য মানে প্রতিভার অপচয়। বৈষম্যের কারণে মেধাবী কৃষ্ণাঙ্গরা সঠিক শিক্ষা বা চাকরি পায় না। ফলে সমাজ হারায় একজন আবিষ্কারক, বিজ্ঞানী, ডাক্তার অথবা একজন দায়িত্বশীল কর্মজীবী। সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সিঙ্গাপুর আজ যেখানে, সেখানে পৌঁছাতে পারেনি অনেক আফ্রিকান দেশ, যার একমাত্র কারণ নিপীড়ন নয়, নিও-কোলোনিয়ালিজমও।
ডিজিটাল ব্যাংকিং চালু করা, রাস্তাঘাট উন্নত করা সব সম্ভব হলেও যদি সমাজের একটি অংশকে ‘অন্য’ করে রাখা হয়, একই কাতারে ফেলা না যায়, তবে কোন পরিকল্পিত উন্নয়নও প্রকৃত উন্নয়ন নয়।
অনেক ক্ষেত্রেই আজকের বিশ্বব্যবস্থায় ঔপনিবেশিকতার প্রভাব স্পষ্ট। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যই ঔপনিবেশিক শক্তি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের ভোটাধিকারে ইউরোপ-আমেরিকার আধিপত্য। ‘গ্লোবাল নর্থ’ নামক যে ৩০টি দেশ, তারা বিশ্বের সম্পদের ৮০% ভোগ করে।
মিডিয়া থেকে শুরু করে কসমেটিকস কোম্পানিগুলো ফর্সা রংকে যেভাবে কালো রঙের উপর প্রাধান্য দেয়, তাতে এই সমস্যা আরও জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠছে। এভাবে বর্ণবাদ ও ঔপনিবেশিকতা আজ ‘পোস্ট-কোলোনিয়াল’ মুখে বিশ্বব্যবস্থাকে অন্যায্য রাখছে।
আমরা আজীবন এই কোলোনিয়ালিজমের দাস হয়ে থাকতে চাই না। এজন্য প্রথমত, উন্নয়নকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করতে হবে। উন্নয়ন মানে শুধু সংখ্যাগত ঊর্ধ্বগতি নয়, উন্নয়ন মানে জিডিপির উচ্চহার নয়, উন্নয়ন মানুষের আয়ু, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা, মর্যাদা এসবের সমষ্টিগত রূপ। কেপ টাউনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডিকোলোনাইজেশন পাঠ্যসূচি চালু হওয়া, অক্সফোর্ডে ‘রাইজ অব দ্য রেস্ট’ পড়ানোর মাধ্যমে যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা সত্যি প্রশংসনীয় ও অনুকরণযোগ্য।
দ্বিতীয়ত, ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনা ও বাস্তবায়ন কর্মসূচি চালু করতে হবে। ইতিমধ্যে, ত্রিনিদাদ ও বার্বাডোসের নেতৃত্বে ক্যারিবীয়ান দেশগুলো ইউরোপের কাছে দাসপ্রথার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শহর কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়কে ঘর-জমি ফিরিয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর ভোট সংস্কার জরুরি।
তৃতীয়ত, বর্ণবাদী কাঠামো ভাঙতে মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। স্কুল থেকে শুরু করে মিডিয়া, চলচ্চিত্র পর্যন্ত। ‘পিপল টু পিপল’ ডায়লগ প্রয়োজন। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘কেউ ঘৃণা নিয়ে জন্মায় না, ঘৃণা তার শেখা। তাই, যদি ঘৃণা শেখা যায়, তাহলে ভালোবাসাও শেখানো যায়।’
আমরা মানুষ, এই সত্যই বুকে ধারণ করতে হবে। কোন সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ ও ঔপনিবেশিকতার আড়ালে নিজেদের অধিকার, বন্ধন, শক্তি কোনটাই ভেঙে ফেলা যাবে না। পৃথিবীতে যখন সমতার নীতি চালু হবে, তখনই বন্ধ হবে যুদ্ধ, বৈষম্য ও অরাজকতা।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়