আজ ১০ মে, বিশ্ব মা দিবস। মাকে ভালোবাসার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন না হলেও, মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বছরে একটি দিনকে বিশেষভাবে উদযাপন করা হয়। ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মা দিবস পালনের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়, যা আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে।
ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেবো।” এই উক্তিই প্রমাণ করে, একটি জাতির ভিত্তি নির্মাণে মায়ের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না; তিনি তাকে শেখান পথচলা, স্বপ্ন দেখা এবং মানুষ হয়ে ওঠা।
প্রত্যেক মানুষের বেড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, ভালোবাসা ও জীবনবোধ। যা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেখাতে পারে না। এমনই কিছু অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বর্তমান সময়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী, যা তুলে ধরেছেন ডিআইইউ প্রতিনিধি আবুল খায়ের।
মা:আমার স্বপ্নের বাতিঘর
ফজরের আজানের সুমধুর শব্দের সাথে পৃথিবীর বুকে মায়ের কোলে আমার আগমন ঘটে ।সেই থেকেই হাটি হাটি করে মায়ের সাথে আমার পথচলার শুরু ।কখনো নিবিড়;কখনও প্রবল সমালোচক ছিলেন আমার মা ।মায়ের নিদারুণ ইচ্ছে ছিলো,তার অপূর্ণ সমস্ত কিছুর পূর্ণতা ঘটুক মেয়ের হাত ধরে ।আর তাইতো সেই যাত্রাপথ কখনো সমতল;কখনোবা বন্ধুর ।উচুনিচু সেই চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ আমি সেই সুদিনের প্রান্তে ।শৈশবে ছিলাম মায়ের পাড়ভক্ত ।মা আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক যার হাত ধরে স্কুল জীবন শুরু করেছি ।টোনাটুনির সংসারে বাবা-মা’ র সবটুকু উজাড় করা আদর-অনুশাসনে বড় হয়েছি আমি ।মা স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আকাশ ছোয়ার ।সেই স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগিয়ে পঞ্চম শ্রেণীতেই হয়েছিলাম দেশসেরা ।অতপর,বিভাগীয় সহ জাতীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় আমার প্রাণবন্ত পদচারণা ।সমস্ত হতাশা,অপ্রাপ্তি আর অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুর সবটুকু জুড়েই তিনি ।চরম হতাশার দিনগুলোতে সবসময় বলতেন,আমি জানি তুই পারবি ।মায়ের ওই প্রবল আত্মবিশ্বাসের শক্তি কে হাতিয়ার বানিয়ে আজও উড়ে বেড়াই দিগ্বিদিক ।মায়ের হাজারো রাত জাগা প্রহর কেটেছে আমার অসুস্থতায় ।আজও হাজার বাহানার পাতা সাজাই;ঘরে ফিরি মায়ের তীব্র আশাতুর চোখের প্রতীক্ষায় ।মা আমার পরম বন্ধু;আমি তার নাড়িছেড়া যক্ষের ধন ।কখনও বলা হয়নি মা কে,আমি তোমাকে অসম্ভব ভালবাসি
সামিহা সিরাজী লাজ
শিক্ষার্থী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মা, ভালোবাসার এক চিরন্তর আধার
মা মানে শুধু একটি শব্দ নয়, মা মানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মমতা আর জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে মায়ের ভালোবাসার সাথে অন্য কিছুর তুলনা করতে পারে। নিজের সব কষ্ট, দুঃখ আর স্বপ্ন লুকিয়ে রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর নামই মা। রাত জেগে সন্তানের পাশে থাকা, নিজের সুখ ত্যাগ করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার মানুষটাই মা।
আমরা হয়তো অনেক সময় মায়ের ত্যাগ বুঝতে পারি না, কিন্তু জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের দোয়া আমাদের আগলে রাখে। মা ছাড়া পৃথিবী যেন অসম্পূর্ণ।
মা দিবসে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ সকল মাকে সুস্থ, নিরাপদ ও দীর্ঘায়ু দান করুন। যাদের মা আজ পৃথিবীতে নেই, আল্লাহ তাদের জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।
মো: রফিকুল ইসলাম প্রামাণিক
শিক্ষার্থী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
মা, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক
মা জীবনের প্রথম শিক্ষক—এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে নির্মল সত্য। আর এই সত্যটি কেবল বইয়ের সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি অনুভবের গভীরে লেখা একটি অদৃশ্য অধ্যায়।
পৃথিবীতে আসার পর একটি শিশুর প্রথম আশ্রয়, প্রথম ভাষা, প্রথম অনুভূতি—সবকিছুই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। তাঁর কোলই যেন এক ছোট্ট বিদ্যালয়, যেখানে ভালোবাসা, শাসন আর যত্ন মিলেমিশে গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের মানুষটি।
মা শব্দে নয়, কাজে শেখান। তিনি দেখান কীভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয়, কষ্টের মাঝেও ধৈর্য ধারণ করে এগিয়ে যেতে হয়, আর ছোট ছোট আনন্দের মাঝে সুখ খুঁজে নিতে হয়। তাঁর প্রতিটি ত্যাগ নিঃশব্দ হলেও, তার প্রভাব সন্তানের জীবনে গভীর ও স্থায়ী হয়।
মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, আর তাঁর শিক্ষা আজীবনের পথনির্দেশ। জীবনের কঠিন সময়ে বারবার মনে পড়ে তাঁর উপদেশ আর আদর্শ। একজন মানুষের চরিত্র ও মননের প্রথম ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের হাতেই—তিনি শুধু জন্মদাত্রীই নন, তিনি একজন সন্তানের জীবনের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।
মায়ের শেখানো সেই নীরব শিক্ষা সময়ের সাথে পুরোনো হয় না, বরং প্রতিটি বয়সে নতুন করে অর্থ খুঁজে দেয়। পৃথিবীর সব জ্ঞান যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় মায়ের শেখানো মানবতার পাঠ। সত্যিকারের সাফল্যের পেছনে যে নীরব শক্তি কাজ করে, তার নামই হচ্ছে 'মা'।
তাবাসসুম নিশু
দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মা: ভালোবাসা, মমতা ও অনুপ্রেরণার চিরন্তন প্রতীক
মা কেবলই একটি শব্দ নয়, বরং এমন একটি অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টসাধ্য। এই শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে হাজারো আবেগ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা। এই আবেগ এতটাই বিশুদ্ধ ও স্বার্থহীন যে এর কোনো তুলনা হয় না। যে মমতার ছায়াতলে একটি সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, ছোট্ট চারাগাছ থেকে পরিপক্ব বটগাছে পরিণত হয়—তার নামই হলো মা।
মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের শুরু থেকেই সবচেয়ে সম্মানজনক আসনে রয়েছেন মা। মায়ের প্রতি আবেগ, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হয়ে আসছে প্রাচীনকাল থেকে। প্রাচীন কবি, সাহিত্যিক ও দার্শনিক সকলেই মাকে দিয়েছেন এক অনন্য মর্যাদা। পারস্যের সুফি বায়েজিদ বস্তামীর মায়ের প্রতি অবিশ্বাস্য ও অকৃত্রিম ভালোবাসা পৃথিবীজুড়ে সকলের কাছেই পরিচিত।
মাকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়ার উদ্দেশ্য থেকেই মা দিবসের উৎপত্তি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক মহীয়সী নারী আনা জার্ভিস মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য বিশেষ একটি দিন পালনের উদ্যোগ নেন। তিনি তা বাস্তবায়ন করতে না পারলেও তার মেয়ের প্রচেষ্টায় বছরের দ্বিতীয় মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে আজ ৯০টিরও বেশি দেশে এই দিনে মায়ের সম্মানে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় এবং মর্যাদা দেওয়া হয়।
মা দিবসে সবাই তাঁদের মমতাময়ী মাকে স্মরণ করে, মাকে উপহার দেয়, মায়ের সাথে সময় কাটায় এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করে। ছোট শিশুরা এদিন মায়ের উদ্দেশ্যে গল্প, কবিতা লেখে এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। কিশোররা মায়ের সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটায়, কেক কাটে, বেড়াতে যায় এবং ছবি তুলে দিনটিকে স্মরণীয় করে তোলে। অনেকে মায়েদের জন্য পছন্দের উপহার দিয়ে চমক দেয়। গুরুজনেরা তাঁদের মায়ের সাথে কাটানো স্মৃতিময় সময় মনে করে আবেগাপ্লুত হন।
পৃথিবীতে মায়ের ভালোবাসার চেয়ে খাঁটি কিছু নেই। এই ভালোবাসা স্বার্থের নয়, জনম-জনমের। ছায়ার মতো যিনি আমাদের আগলে রাখেন, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন বছরের প্রতিটি দিনেই অপরিহার্য। প্রত্যাশা, ভালো থাকুক জগতের সকল মা; পৃথিবীজুড়ে তাঁরা আগলে রাখুন আমাদের চরম মমতায়।
ফারহান সাদিক তানিম
শিক্ষার্থী, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি
সময় জার্নাল/একে