নিজস্ব প্রতিবেদক:
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যমান ঋণচুক্তি থেকে সরে আসার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পরিবর্তে সংশোধিত শর্তে নতুন করে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে ঢাকা।
গত ২১ মে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল এবং আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকে এই বড় নীতিগত পরিবর্তনটি নিশ্চিত করা হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আজ (২৫ মে) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই ভার্চুয়াল সভায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আইএমএফের চলমান কর্মসূচিগুলোর অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফলপ্রসূ আলোচনার কথা স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আইএমএফের বিদ্যমান কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রণয়ন করা হয়েছিল।
মন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, দেশের অভ্যন্তরে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে আগের চুক্তির কিছু কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সরকার সংস্কার থেকে পুরোপুরি পিছিয়ে যেতে চায় না; বরং দেশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বাস্তবসম্মত ও সুশৃঙ্খল সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে, নবনির্বাচিত সরকারের অধীনে আইএমএফের একটি সম্পূর্ণ নতুন ঋণ কর্মসূচি চালুর বিষয়ে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। নতুন এই খসড়া কাঠামোয় তিন বছরের একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমার মধ্যে অর্জনযোগ্য এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কারগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইএমএফের নাইজেল ক্লার্ক বাংলাদেশের নতুন সংস্কার উদ্যোগ ও নতুন ঋণ সুবিধার প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তিনি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
উভয় পক্ষ বাস্তবায়নযোগ্য ও বাস্তবতাভিত্তিক ঋণ প্যাকেজের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছে এবং প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের কঠোর কিছু শর্তের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চলা অচলাবস্থার জেরেই মূলত এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইএমএফের পক্ষ থেকে সব ক্ষেত্রে অভিন্ন ১৫ শতাংশ ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আরোপ, কর ছাড় বাতিল করা এবং বিদ্যুৎ ও সারে দেওয়া সর্বজনীন সরকারি ভর্তুকির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট নগদ অর্থ স্থানান্তরের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল।
এছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬–এ সাম্প্রতিক সংশোধনী নিয়েও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদাররা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এটি স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
এসব বিষয়ে অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনস্বার্থ ও বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বিরুদ্ধে যায়—এমন দাতা সংস্থার শর্ত মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
উচ্চপর্যায়ের আর্থিক কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফ কর্মসূচি চালু থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করে এবং এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ হয়।
নতুন বিকল্প কাঠামোর ঋণের পরিমাণ, সময়সীমা ও শর্ত চূড়ান্ত করতে আগামী জুলাই বা আগস্টে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে।
এমআই