অধ্যাপক ডা. কাজী নওশাদ হোসাইন:
১৪ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয়েছে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। স্বেচ্ছায় ও বিনা পারিশ্রমিকে রক্তদানকারী মানুষের অসামান্য অবদানকে সম্মান জানানো এবং নিরাপদ রক্তের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ১৪ জুন দিবসটি পালন করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্প্রদায়ের কাছে দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ রক্ত এমন একটি জীবনরক্ষাকারী উপাদান, যা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। একজন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার দেওয়া এক ইউনিট রক্ত দুর্ঘটনায় আহত রোগী, প্রসূতি মা, ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, থ্যালাসেমিয়া রোগী কিংবা জটিল অস্ত্রোপচারের রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উদযাপিত হয় রক্তের গ্রুপ আবিষ্কারক বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টাইনারের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে। তাঁর আবিষ্কার আধুনিক ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের ভিত্তি স্থাপন করে এবং নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে পর্যাপ্ত ও নিরাপদ রক্তের মজুদ অত্যন্ত জরুরি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে রক্তের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, রক্তব্যাংক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। এসব কর্মসূচির মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান ক্যাম্প, সচেতনতামূলক সেমিনার, র্যালি, মানববন্ধন, নতুন রক্তদাতা সংগ্রহ অভিযান এবং নিয়মিত রক্তদাতাদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।
নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করতে শুধু রক্ত সংগ্রহই নয়, বরং রক্তদাতা নির্বাচন, রক্ত পরীক্ষা, সংরক্ষণ ও সঞ্চালনের প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি রক্তদান সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করে তরুণ প্রজন্মকে এ মানবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশেও দিবসটি উদযাপনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন এনজিও, রক্তদান সংগঠন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করে। দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারণা, শিক্ষামূলক কর্মসূচি, রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ক্যাম্পের আয়োজন করে।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস কেবল একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক দিবস নয়; এটি মানবতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য প্রতীক। একজন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা অজানা একজন মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দেন। তাই সমাজের প্রতিটি সুস্থ মানুষের উচিত নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসা।
দিবসটির প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন— “রক্ত দিন, আশা দিন; একসাথে জীবন বাঁচাই।”
স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও টেকসই রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত হলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।
লেখক: অধ্যাপক ডা. কাজী নওশাদ হোসাইন, সমন্বয়ক, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ (ব্লাড ব্যাংক, ইউনিকো হাসপাতাল।