মোঃ মুরাদ হোসেন:
দৃশ্যকল্পঃ সকালের নাশতায় গরম পরোটা আর সবজি খেয়ে স্কুলে গেল একটি শিশু। বিকেলে হঠাৎ তার পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া শুরু হলো। পরিবারের ধারণা ছিল, হয়তো সাধারণ কোনো অসুস্থতা। কিন্তু পরে জানা গেল, খাবারে ব্যবহৃত নিম্নমানের তেল ও দূষিত উপাদানই ছিল অসুস্থতার কারণ।
ঘটনাটি কাল্পনিক হলেও বাংলাদেশে এমন ঘটনা প্রতিদিন অসংখ্য পরিবারকে মোকাবিলা করতে হয়। কারণ আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
প্রতি বছর ৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস (World Food Safety Day)। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদক, ব্যবসায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তাদের সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করা। নিরাপদ খাদ্য শুধু সুস্বাস্থ্যের জন্য নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং টেকসই সমাজ বিনির্মাণেরও অন্যতম পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশ গত এক দশকে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ধান, মাছ, সবজি, ফলমূল ও পোলট্রি উৎপাদনে দেশ আজ অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি। কিন্তু খাদ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে খাদ্য মানুষের জন্য আশীর্বাদের বদলে বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের দেশে খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভেজাল, অননুমোদিত রাসায়নিকের ব্যবহার, খাদ্যে জীবাণু দূষণ এবং অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাতকরণ। ফল পাকাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, মাছ বা মাংস সংরক্ষণে অনিয়ন্ত্রিত পদার্থের ব্যবহার, নিম্নমানের মসলা বা তেল বাজারজাতকরণ—এসব বিষয় ভোক্তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। যদিও সরকারি নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, তবুও চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। একজন কৃষক যখন সঠিক মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করেন, একজন খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যখন গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (GMP) অনুসরণ করে, একজন বিক্রেতা যখন পরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য বিক্রি করেন এবং একজন ভোক্তা যখন সচেতনভাবে খাদ্য নির্বাচন করেন—তখনই নিরাপদ খাদ্যের শৃঙ্খলটি সম্পূর্ণ হয়।
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমও এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খাদ্যে ভেজাল শুধু একটি আইনগত অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
বর্তমান সময়ে খাদ্যশিল্পে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ (Quality Control), গুড ল্যাবরেটরি প্র্যাকটিস (GLP), HACCP, ISO 22000-এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। আধুনিক পরীক্ষাগার, দক্ষ জনবল এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্যের ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চার সমন্বয় অপরিহার্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দূষিত খাদ্যের কারণে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ অসুস্থ হয়। এর ফলে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার।
একজন সচেতন কৃষক, দায়িত্বশীল উদ্যোক্তা, সৎ ব্যবসায়ী, দক্ষ পরীক্ষাগারকর্মী এবং সচেতন ভোক্তার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ খাদ্যের বাংলাদেশ। নিরাপদ খাদ্য মানে শুধু নিরাপদ জীবন নয়; এটি একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি।
লেখক: মোঃ মুরাদ হোসেন
বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক, পাবনা।