সময় জার্নাল ডেস্ক:
ভারতে বেকারত্ব এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন এখন দেশটির জাতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বেকার যুবকদের সমর্থনে গড়ে ওঠা কাল্পনিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) উত্থানে মোদি সরকারের ঘুম হারাম হওয়ার মত পরিস্থিতি হয়েছে। তবে এই আন্দোলনের তীব্রতার মাঝেই ভারতের মুসলিম সমাজ ও ধর্মীয় নেতারা চরম সতর্ক অবস্থান নিয়ে মুসলিম যুবকদের এই প্রতিবাদ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত মে মাসে। সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার শুনানির সময় বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার তরুণ আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টদের লক্ষ্য করে ‘পরজীবী’ এবং ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) শব্দ ব্যবহার করেছেন এমন অভিযোগ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আদালতের এই ‘অপমানজনক’ মন্তব্যে দেশজুড়ে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এই ক্ষোভকে প্রতীকী রূপ দেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট ও রাজনৈতিক কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে। তিনি ব্যঙ্গের সুরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহে ইনস্টাগ্রামে এর ফলোয়ার সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। যা ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টকেও পেছনে ফেলেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অনলাইনের এই জোয়ার বাস্তবে রূপ নেয় গত শনিবার (৬ জুন)। দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির ডাকে বিশাল যুব সমাবেশ হয়। ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নীট) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা মাথায় তেলাপোকার মুখোশ ও হাতে ‘আমিই তেলাপোকা’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে যখন এই আন্দোলন চলছে, তখন মুসলিম সমাজের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব এবং মসজিদের ইমামরা তরুণদের এই প্রতিবাদ থেকে দূরে থাকার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, সোশ্যাল মিডিয়া এবং জুমা'র খুতবার মাধ্যমে বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, "প্রতিবাদ কয়েক ঘণ্টা চলতে পারে, কিন্তু এর আইনি ও সামাজিক পরিণতি বছরের পর বছর ভোগ করতে হতে পারে।"
মুসলিম নেতৃত্বের এই সাবধানতার মূল কারণ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলন ও দিল্লি দাঙ্গার তিক্ত অভিজ্ঞতা। নেতারা আশঙ্কা করছেন, বিক্ষোভে কোনো বিশৃঙ্খলা হলে মুসলিম যুবকদেরই সবার আগে বলির পাঁঠা বানানো হতে পারে। তাই আবেগ দিয়ে নয়, বরং বুদ্ধি খাটিয়ে রাজপথের আন্দোলনের চেয়ে শিক্ষা ও ক্যারিয়ারে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ইমামরা। ফলে এই বিক্ষোভে মুসলিম যুবকদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই নগণ্য।
ভারতে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯% এবং দেশটির ৬৫% মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ এখন ‘তেলাপোকা’ প্রতীকে রাজপথে আছড়ে পড়ছে। বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতেও এই পরিস্থিতিকে অবহেলার সুযোগ নেই। প্রথমে একে ‘সোশ্যাল মিডিয়ার কৌতুক’ বলে উড়িয়ে দিলেও, রাজপথে তরুণদের এই জোরালো উপস্থিতি মোদি সরকারের সামনে এখন এক নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
তথ্য সূত্র: দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, আমার দেশ, ইনকিলাব
একে