সকালের ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কেমন, সেটা বোঝাতে আলাদা কোনো উপমা লাগে না। সাতারকুল, বাড্ডার এই ক্যাম্পাসে সকাল নামলেই চারপাশে এক ধরনের কুয়াশাচ্ছন্ন গ্রাম্য অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে কেউ যেন মেঠো পথে হাঁটছে। দূরে কোনো ক্লাসরুমে লেকচার শুরু হওয়ার আগেই, এই বিশ্ববিদ্যালয় জেগে ওঠে অন্য কিছু মানুষের হাতে যাদের নাম সিলেবাসে নেই, ছবিও থাকে না কোনো ব্রোশিওরে।
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আজ প্রায় ৯ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা। এখানে প্রতিদিন জ্ঞান তৈরি হয়, ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের পেছনে যে নীরব শ্রম, তার গল্প খুব কমই শোনা যায়।
ভোরের আলো ফোটার আগেই ক্যাম্পাসে হাঁটতে দেখা যায় একজন মানুষকে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই মানুষটি দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকেন গেটের কাছে। শিক্ষার্থীরা তাড়াহুড়ো করে ঢুকে পড়ে, কেউ তাকায়, কেউ তাকায় না। তার চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু বিরক্তি নেই। তিনি বলেন, “সকাল থেকে রাত এই জায়গাটাই এখন আমার ঘর। ছেলেমেয়েগুলো নিরাপদে থাকলেই শান্তি পাই।” নাম বলেন না, বলতেও চান না। হয়তো তার পরিচয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথেই সীমাবদ্ধ।
আরেকজন আছেন, যিনি ক্যাম্পাসের ভেতরের পথগুলো প্রতিদিন পরিষ্কার করেন। তার হাতের ঝাঁটার শব্দে শুরু হয় দিনের প্রথম নীরব সঙ্গীত। তিনি বলেন, “আমরা না থাকলে জায়গাটা সুন্দর থাকবে না। কিন্তু কেউ সেটা খেয়ালও করে না।” কথার ভেতর কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু স্বীকারোক্তি এই বিশ্ববিদ্যালয়টা তার জীবনের অংশ।
ক্যাম্পাসের দুইটি ক্যান্টিন একটি নতুন ক্যাম্পাসে, আরেকটি পুরোনো ক্যাম্পাসে। পুরোনো ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনটি প্রকৃতির মাঝে খোলামেলা। গাছের ছায়া, হালকা বাতাস আর চায়ের কাপে জমে থাকা আড্ডা। এখানে শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, নন-টিচিং স্টাফরাও একটু সময়ের জন্য বিশ্রাম নেন। এই জায়গাগুলোই তাদের নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেয়।
শিক্ষার্থীদের চোখে এই বিশ্ববিদ্যালয় কেমন? ফারহানা আফরিন নিহা, ফার্মেসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী, বলেন—
“ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষার্থী হতে পেরে আমি গর্বিত। এখানে পড়াশোনার পরিবেশ, শিক্ষকদের আন্তরিকতা আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে।”
নন-টিচিং স্টাফদের কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে আলাদা উষ্ণতা—
“তারা খুবই সহযোগিতাপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ। সবসময় আমাদের পাশে থাকে।”
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা হামিদ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে, বলেন—
“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে খুব আবেগের জায়গা। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় শুরু হয়েছে এখান থেকেই।”
তার মতে, নন-টিচিং স্টাফদের আন্তরিকতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে আরও সহজ ও স্বচ্ছন্দ করে তোলে।
সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে অন্যরকম এক নীরবতা নামে। দিনের কোলাহল থেমে গেলে মাঠ আর লেকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলো-ছায়া যেন আলাদা করে কথা বলে। কেউ কেউ বেঞ্চে বসে থাকে, কেউ হেঁটে যায় ধীরে। এই সময়টায় বোঝা যায়—বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস আর পরীক্ষার জায়গা নয়, এটা মানুষের অনুভূতিরও আশ্রয়।
একদিন মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ থমকে গিয়েছিলাম। দেখলাম, একজন কর্মচারী দিনের কাজ শেষ করে চুপচাপ বসে আছেন। চারপাশে শিক্ষার্থীদের হাসি, গল্প—আর তার মুখে নীরব প্রশান্তি। তখন মনে হলো, আমরা যারা এখানে পড়ি বা পড়াই, আমরা কি কখনো ভেবেছি এই জায়গাটা আমাদের জন্য যে সহজ, সেটা কার শ্রমে সম্ভব?
এই গল্প লেখার ইচ্ছে তখনই জন্ম নেয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল শক্তি শুধু ক্লাসরুমে নয়। আছে সেই মানুষগুলোর হাতে, যারা প্রতিদিন অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান ভবিষ্যৎ তৈরি করে।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি একেকটি নীরব জীবনের সমষ্টি। প্রশ্ন থেকে যায় আমরা কি কখনো তাদের দিকে ফিরে তাকাবো? নাকি তারা চিরকাল সিলেবাসের বাইরেই থেকে যাবে?
লেখক: মোঃ হৃদয়
ডিআইইউ প্রতিনিধি
কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি