ইবি প্রতিনিধি:
অপরিষ্কার খাবার পানি, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট, সাপের উপদ্রব, মশার প্রকোপ, ডাইনিংয়ের নিম্নমানের খাবারসহ নানানমুখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শহিদ জিয়াউর রহমান হল। প্রশাসন ও হল প্রভোস্টের কাছে বারবার দাবি তোলা হলেও বছরের পর বছর এ সমস্যার সমাধান মিলছে না বলে দাবি হলটির শিক্ষার্থীদের। এদিকে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. গফুর গাজীর বিরুদ্ধে ডাইনিংয়ে ভর্তুকির টাকা কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, শহিদ জিয়াউর রহমানের নামানুসারে নাম হওয়ায় দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে সকল দিক থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল হলটিকে। তবে ২৪ এর অভ্যুত্থানের পরেও পাল্টেনি চিত্র। অভ্যুত্থানের পরে দীর্ঘ দশমাস হল প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করলেও কোনো ধরনের উন্নয়ন করতে পারেনি তৎকালীন প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সনের মে মাসে হলটিকে বড়ো ধরনের ঋণের কবলে ফেলে দায়িত্ব শেষ করেন তিনি।
এদিকে অধ্যাপক জাকির হোসেনের দায়িত্ব শেষে প্রভোস্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. গফুর গাজী। তার প্রতি শিক্ষার্থীদের বড়ো ধরনের প্রত্যাশা থাকলেও বরাবরের ন্যায় তিনিও শিক্ষার্থীদের করেছেন হতাশ। তিনিও করতে পারেননি হল সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান। এদিকে তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে গত ১১ এপ্রিল প্রোভোস্ট অফিসে তালা দেয় হল শিক্ষার্থীরা। পরে সেখানে তিনি উপস্থিত হলে তার সাথে দীর্ঘক্ষণ বাগ্বিতণ্ডা হয় শিক্ষার্থীদের। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সেখানে উপাচার্য উপস্থিত হন। এছাড়া ১৫ এপ্রিল মিটিং এ বসে শিক্ষার্থীদের সকল দাবি শোনার আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন তিনি। এদিকে, আজ (১৫ এপ্রিল) বিকালে মিটিং এ বসলে উপাচার্যের সাথেও বাকবিতন্ডা হয় শিক্ষার্থীদের। পরবর্তীতে, সকল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রভোস্ট ও প্রক্টরকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে মিটিং শেষ করে উপাচার্য।
এদিকে হল ডাইনিং-এর ভর্তুকির টাকা কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই প্রভোস্ট গফুর গাজীর বিরুদ্ধে। জানা যায়, প্রতি মাসে প্রত্যেক হলে শিক্ষার্থীদেরকে ভালো খাবার প্রদান করার শর্তে ডাইনিংয়ের ভর্তুকি বাবদ সর্বনিম্ন ৪০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা প্রদান করার চুক্তি রয়েছে হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাঝে। কিন্তু, শহিদ জিয়াউর রহমান হলের ডাইনিং এ ৩৫ হাজার টাকা করে ভর্তুকি দেওয়ার কারণে খাবারের মান উন্নত করতে পারছেন না বলে দাবি করেছেন ডাইনিং ম্যানেজার।
তিনি বলেন, আমাকে প্রথম কয়েকমাস ৩৫ হাজার নেওয়ার অনুরোধ করেছিল দেখেই রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু, পরবর্তী অনেকবার দেখা করে ৪০হাজার করে দেওয়ার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু স্যার সেটা করেনি। এমনকি গত রমজান মাসের টাকাও এখনো আমি হাতে পাইনি। এ মাসের টাকাও বাকি। এভাবে চললে আমি খাবারের মান কেমনে উন্নত করব?
এদিকে হলের সার্বিক সমস্যার ব্যাপারে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রুবায়াত লিমন বলেন, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে জিয়াউর রহমান নামের কারণে সবচেয়ে অবহেলিত ছিল আমাদের হলটি। কিন্তু বর্তমানেও সেই চিরচেনা দৃশ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানেও হলে বিশুদ্ধ খাবার পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। কিছুদিন আগে ফিল্টার লাগালেও বর্তমানে সেগুলো অকার্যকর অবস্থায় আছে। ওয়াশরুমগুলোতে ঠিকঠাক পানি আসে না, নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে হলের চারপাশে পচনশীল বর্জ্যের স্তুপ তৈরি হলেও সেগুলো পরিষ্কারের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মশার প্রকোপ বৃদ্ধি পেলেও মশা নিধনে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আমরা প্রভোস্ট এবং প্রশাসনকে বারবার বলা সত্ত্বেও তারা কোনো ভ্রূক্ষেপই করেনা। আমরা দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান চাই।
আরেক শিক্ষার্থী নাইম ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর ইবির অন্যান্য হলের পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও শহীদ জিয়াউর রহমান হলের কোনো পরিবর্তন হয়নি। হল প্রশাসনের কাছে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে অভিযোগ জানালে সেগুলোর সমাধান হতে মাসের পর মাস সময় লেগে যায়। ভিসি স্যার, ট্রেজারার স্যার বেশ কয়েকবার মিটিং করে গেছেন এবং সমস্যাগুলো সমাধান করার আশ্বাস দিয়ে গেছেন। সেগুলো আশ্বাসেই আটকে আছে, সমাধান আর হয়নি। আমাদের রিডিং রুমে বসার মতো অবস্থায় নেই। খাবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, অন্যান্য হলে ৪০ হাজার টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও আমাদের হলে দেওয়া হয় ৩৫ হাজার। আমরা হলে এমনভাবে বসবাস করি যে, এর চেয়ে বস্তিতেও মানুষ ভালোভাবে বসবাস করতে পারে। আমরা আর এভাবে চলতে দিতে পারি না। সকল সমস্যার কার্যত সমাধান চাই।
এ ব্যাপারে হলটির প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. গফুর গাজী বলেন, আসলে হলের ডাইনিং এ কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয়না। তবে, কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রশাসন থেকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তবে, এটা সত্য যে আমি ডাইনিং ম্যানেজারকে ভর্তুকি হিসেবে ৩৫০০ টাকা দিই। কারণ, তার সাথে প্রথমে ৩৫০০টাকা দেওয়ারই চুক্তি করেছিলাম। আর পানির ফিল্টার বন্ধ করার কারণ ছিল যে, সেটা থেকে ঠিকঠাক পানি পাওয়া যেত না। এজন্য, এক্সপার্টদের পরামর্শে, ভালো পানি সরবরাহ করার জন্যই সাবমারসিবল-এর ব্যবস্থা করেছি। হলের অন্যান্য যত সমস্যা রয়েছে, সব সমস্যা সমাধানের জন্য আমি বারবার প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু, প্রশাসন আমাকে ঠিকঠাক বাজেট না দেওয়াতে, সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারিনি।
ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডাইনিং এর ভর্তুকির ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল প্রশাসনের একটি চুক্তি রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ডাইনিংগুলোতে হল ভেদে সর্বনিম্ন ৪০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা। যার মধ্যে বড়ো একটি অংশ প্রশাসন দিবে এবং বাকি অংশ হল প্রশাসন দিবে। তবে, ডাইনিং এ ভর্তুকি প্রদানের পরিমাণ কোনো হলেই ৪০ হাজার-এর কম হওয়ার চুক্তি নেই। এক্ষেত্রে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডাইনিংয়ে যে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে এমনটা হওয়ার কথা না।
এমআই