বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

পথ খাবার তৈরি করছে মানসিক বিষণ্ণতা: স্বাদের আড়ালে এক আত্মঘাতী আসক্তি

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬
পথ খাবার তৈরি করছে মানসিক বিষণ্ণতা: স্বাদের আড়ালে এক আত্মঘাতী আসক্তি

লাবনী আক্তার শিমলা:

ফুটপাতের পাশে ফুচকাওয়ালার হাতের অমৃত স্বাদের ফুচকা, চটপটি, বিকেলের নরম রোদে ছোলা মাখানো, ঝালমুড়ির স্বাদই যেন বাঙালির আবেগের এক পরম উৎকর্ষ। যে অনাবিল আনন্দ পাওয়া যায় এই ফুটপাতের খাবারে, তা হয়তো আর কোনো কিছুর সাথেই তুলনীয় নয়; কিন্তু পৃষ্ঠার অপর পাশ বলে ভিন্ন কথা। পথ খাবারে অসংখ্য জীবাণু আমাদের আক্রান্ত করে না শুধু, এর নিম্নমানের কারণে আমাদের স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিসাধন করে। কেবল শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, গবেষণা বলছে মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও বিরূপ প্রভাব ফেলে এই সমস্ত পথ খাবার। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নিয়মিত পথ খাবার গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণ মানুষের তুলনায় গভীর মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ।

লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ হতে জানা যায়, যারা নিয়মিত ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খান, তাদের বিষণ্ণতার হার ৫৮% বেশি। International Journal of Epidemiology, ২০১৯ গবেষণা থেকে জানা যায়, উচ্চমাত্রায় ট্রান্স-ফ্যাটযুক্ত খাবার গ্রহণকারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ও তীব্র ডিপ্রেশনের ঘটনা ৪৮% বেশি। চীনা একাডেমি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস ১৬,৩০০ কিশোর-কিশোরীর উপর পরীক্ষিত এক গবেষণা জানায়, সপ্তাহে ৩-৪ বার পথ খাবার খেলে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

পথ খাবারে উপস্থিত থাকে অতিরিক্ত পরিমাণ ট্রান্স ফ্যাট, শর্করা ও সোডিয়াম। এই তিন উপাদান আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে সাময়িক উত্তেজিত করে। আমরা যত বেশি পথ খাবার খাই, আমাদের মস্তিষ্কের সেই ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর আমরা তত বেশি পড়ে যাই দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও বিষণ্ণতার দিকে। আমাদের অন্ত্রকে বলা হয় দ্বিতীয় মস্তিষ্ক। পথ খাবারের নিম্নমানের তেল ও রাসায়নিক উপাদান অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া (যেমন—ল্যাকটোব্যাসিলাস, বাইফিডোব্যাকটেরিয়াম) ধ্বংস করে। যেহেতু শরীরের ৯৫ শতাংশ সুখ ও প্রশান্তির হরমোন সেরোটোনিন অন্ত্রে তৈরি হয়, তাই হজমের গোলমাল সরাসরি আমাদের মেজাজকে খিটখিটে করে দেয়।

সিঙ্গারার ক্রাস্ট, ফুচকার খোল—এসব মুচমুচে গঠনের পেছনে দায়ী ট্রান্স ফ্যাট। ট্রান্স ফ্যাট ও চিনি শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে। এটি হিপক্যাম্পাস অঞ্চলকে আক্রমণ করে, যা স্মৃতিশক্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী। আর মস্তিষ্কের প্রদাহে বিষণ্ণতা বাসা বাঁধে। পথ খাবারে অধিকাংশই থাকে শর্করা, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়। অতঃপর, ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মাথায় তা আবার নিচে নেমে আসে। শর্করার অনিয়ন্ত্রিত ওঠানামা মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেয়। এটি সরাসরি অবসাদ ও ঘুমের সমস্যার জন্য দায়ী। পথ খাবারে স্বাভাবিক খাবারের চেয়ে ৫-৬ গুণ বেশি সোডিয়াম থাকে। এই অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা পরোক্ষভাবে বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে এবং মস্তিষ্কে তৈরি করে লবণ আসক্তি।

পুষ্টিগুণ প্রায় শূন্যের কোঠায় এই খাবারগুলোর। এই খাবারগুলোতে থাকে না ভিটামিন বি-১২, আয়রন, জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম ও ওমেগা ফ্যাটি এসিড। আর এইসবের ঘাটতি ভয় ও দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি করে। একই সাথে এই খাবারগুলো মস্তিষ্কে যে ডোপামিন নিঃসরণ করে, তাতে মন হঠাৎ ভালো থাকে; আবার পরক্ষণেই ডোপামিন ক্ষরণ বন্ধ হয়ে মন খারাপ হয়ে যায়, যার প্রচলিত নাম মুড সুইং। অর্থাৎ, পথ খাবার ক্ষণিক স্বস্তি দিলেও কিছুক্ষণ পর দুঃখ, অবসাদ ও বিষণ্ণতা বাড়িয়ে দেয়। আমরা হয়তো সরাসরি এটি বুঝতে পারি না, মনে হয় স্বাভাবিক কোনো অবসাদে ভুগছি; কিন্তু ঘটনা আমাদের দৃষ্টির আড়ালেই তার বাসস্থান গড়ে নিচ্ছে আমাদের তৃপ্তিতে, আনন্দে ও আকাঙ্ক্ষায়।
অধ্যাপক ডা. মেহেরুন্নেসা বেগম, সাবেক পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ঠিকই বলেছিলেন—যে জাতি যত বেশি প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্ট ফুড খায়, সেই প্রজন্ম তত বেশি উদ্বেগ, বিরক্তি ও হতাশায় ভোগে। পথ খাবার আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার ভারসাম্য নষ্ট করে। বর্তমানে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে ১৫-৩৫ বছর বয়সীদের মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ পুষ্টিহীন এই খাবার।

এছাড়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্থানীয় উপদেষ্টা মৃণাল কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, রাস্তার খাবারের ভাজা তেলের মধ্যে 'অ্যাক্রিলামাইড' নামক একটি নিউরোটক্সিন তৈরি হয়, যা মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করে। এটি দীর্ঘমেয়াদে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বাড়ায়। আর ডিমেনশিয়া  হলো মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী অবস্থা, যা স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, আচরণ এবং দৈনন্দিন কাজকর্মের দক্ষতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

আমাদের বাঙালির পক্ষে পথ খাবার বিশেষ করে ফুচকা-ঝালমুড়ি কখনোই একেবারে বাদ দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি, যাতে পথ খাবারের বিরূপ ক্ষতি থেকে নিজেকে কিছুটা বাঁচানো যায়। এজন্য খোলা ট্রেতে বারবার পোড়ানো তেলে ভাজা লাল মরিচের তেল বা গাঢ় বাদামি রঙের স্ন্যাক্স এড়িয়ে চলতে হবে। কেননা, এই তেলেই থাকে সর্বোচ্চ ট্রান্স ফ্যাট। এরপর এ ধরনের পথ খাবার খাওয়ার পর শসা অথবা পেঁপে খাওয়া জরুরি; কারণ শসা ও পেঁপের এনজাইম শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দিতে সাহায্য করে।

সবথেকে ভালো হয় যদি ফুচকার পানির বদলে ঘরে তাজা পুদিনা ও তেঁতুল দিয়ে স্বাস্থ্যকর ফুচকা বানানো যায়। সেদ্ধ ছোলা ও শসার সমন্বয়ে ঘরোয়া চাট বাইরের নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন পানি ও মশলার থেকে অনেক গুণ স্বাস্থ্যকর হবে। এরপর প্রচুর পানি পান করতে হবে, কারণ পানি পথ খাবারের টক্সিন পাতলা করে। সেই সাথে নিয়মিত ঘুম মস্তিষ্কের প্রদাহ কমিয়ে আনে। এছাড়া একটি কঠিন নিয়ম তৈরি করতে হবে নিজেদের জন্য—যেমন সপ্তাহে ১ দিন অথবা মাসে মাত্র ২-৩ বার পথ খাবার খাওয়া যাবে; এরকম নিয়ম পরিবারের মাঝে তৈরি করা। এবং যেসব জায়গায় খোলা অবস্থায় বা বারবার পোড়া তেলে খাবার ভাজা হয়, সেগুলো এড়িয়ে চলার অভ্যাস করতে হবে।

আমরা অনেকেই গভীর বিষাদ, বিষণ্ণতায় ভুগে থাকি। এজন্য শুধু পথ খাবারকে না বলে স্বাস্থ্যকর খাবার নিলেই হবে না, শারীরিক ব্যায়াম করাও জরুরী। কারণ শারীরিক ব্যায়াম মস্তিষ্কের প্রদাহ কমিয়ে আনে এবং মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে পুনর্গঠিত করতে সাহায্য করে। 

একমাত্র তাজা সবজি, ভাত, ডাল, মাছ, দই—এই ধরনের খাবারই আমাদের দেহের ও মনের জন্য উপকারী। শুধু উপকারীই নয়, বরং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণও বটে; কারণ পথ খাবার খাবারের রুচিও নষ্ট করে দেয়। অতএব, স্বাদ ও স্বাস্থ্যের লড়াইয়ে এখনই সময় সচেতন হওয়ার। আমাদের বুঝতে হবে, স্বাস্থ্যের চেয়ে অমূল্য কিছু নেই; সাময়িক তৃপ্তির জন্য স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলা নিজেকে না ভালোবাসারই অপর নাম।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল