আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বছরের পর বছর তিনি অটল ছিলেন—অদম্য, অপরাজিত এবং আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু সোমবার যেন সব সমীকরণ বদলে গেল। মমতা ব্যানার্জি পরাজিত হলেন; নিজভূমে পর্যুদস্ত হওয়ার পাশাপাশি ধসে পড়ল তার রাজনৈতিক দুর্গ। দীর্ঘদিনের প্রতাপশালী তার দল তৃণমূল (টিএমসি) এখন দ্বিতীয় সারির শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
বিজেপির জয়কে 'অনৈতিক' আখ্যা দিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন ৭১ বছর বয়সী মমতা। তবে তার জন্য এটি কেবল একটি নির্বাচনী পরাজয় নয়। এটি একটি নির্মম বাস্তবতা—সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, বছরগুলো ছোট হয়ে আসছে। তিনি যেন এক ডুবন্ত সূর্যকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে দৌড়াচ্ছেন।
দিদির লড়াকু মেজাজ কি এখনো অটুট?
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৫ বছর ধরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জয়রথকে ঠেকিয়ে রেখেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু অবশেষে সেই অদম্য প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল।
বিজেপির সুপরিকল্পিত ও বিরামহীন প্রচারণার কাছে দিদির রাজনৈতিক দুর্গ এবার আর রক্ষা পায়নি। গত পাঁচটি বড় নির্বাচনে—২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪ সালের লোকসভা এবং ২০১৬ ও ২০২১ সালের বিধানসভায় মমতা বারবার বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু লড়াইটা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল।
২০১৬ সালের বিধানসভায় যে বিজেপির আসন ছিল মাত্র ৩টি, ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় ৭৭। আর এবার তারা অবিশ্বাস্যভাবে ২০৬টি আসন দখল করে তৃণমূলকে কার্যত কোণঠাসা করে দিয়েছে।
পরাজয়ের পরপরই মমতাকে দেখা গেছে তার সেই চিরচেনা আগ্রাসী মেজাজে। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বিজেপির সমালোচনা করার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন তিনি। ক্ষোভ উগরে দিয়ে মমতা বলেন, 'বিজেপি ১০০টির বেশি আসন লুট করেছে। এই নির্বাচন কমিশন আসলে বিজেপিরই কমিশন। আমি বারবার অভিযোগ করেছি... কিন্তু তারা কিছুই করছে না।'
দিদি এখন কী করবেন? তার পরবর্তী পদক্ষেপের প্রথম ইঙ্গিতটি পাওয়া গেছে তার বক্তব্যে। তিনি এই পরাজয়কে একটি 'অনৈতিক যুদ্ধ' হিসেবে ফুটিয়ে তুলছেন। ভোটার তালিকা সংশোধন এবং ভোটের আগে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বদলিকে তিনি 'গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা' বলে অভিহিত করেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, মমতা আবারও তার সেই পরীক্ষিত 'বাঙালি বনাম বহিরাগত' কার্ডটি খেলবেন। বিজেপির এই জয়ের মুখে নিজেকে আবারও 'বাংলার রক্ষক' হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন তিনি।
তবে পর্দার আড়ালে এখন অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে নির্বাচনী কৌশল পরিচালনা এবং সম্ভবত প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়েও শুরু হবে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দিদির সামনে এখন প্রথম বড় পরীক্ষা হলো দলের মধ্যে ভাঙন ঠেকানো এবং গণ-পদত্যাগ ও দলবদল রোধ করে নিজের অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা।
কিন্তু তার সবথেকে বড় পরীক্ষা হবে রাজপথে। রাজ্য প্রশাসন আর মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারের ঢাল ছাড়া বিজেপির মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় তিনি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন? তিনি নিঃসন্দেহে রাজপথের লড়াকু নেত্রী, সম্ভবত এই মুহূর্তে ভারতের সবথেকে শক্তিশালী রাজনীতিবিদদের একজন। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর কি তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর মেলা এখন সবথেকে বেশি জরুরি।
এমআই