ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম:
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়েও যখন ইসলামি রাজনীতিতে 'প্রশাসক হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে পুরুষ হওয়া আবশ্যক'—এমন ফতোয়া শোনা যায়, তখন তা কেবল একটি লিঙ্গীয় বিতর্ক থাকে না, বরং ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভারসাম্যকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। সম্প্রতি গবেষক আব্দুর রহীমের "আল কোরআনে রাষ্ট্র ও সরকার" বইটিতে এই সনাতনী ধারার প্রতিফলন দেখে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি হয়েছে।
১. ইতিহাসের কাঠগড়ায় একটি 'বিচ্ছিন্ন' হাদিস
নারী নেতৃত্বকে হারাম করার পেছনে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় আবু বাকরাহ্ (রা.) বর্ণিত সেই হাদিসটি: "যে জাতি একজন নারীকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে, তারা সফল হবে না।" কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই হাদিসটি ছিল পারস্য সম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সম্রাট কিসরার অযোগ্য কন্যার সিংহাসনে আরোহণের একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক মন্তব্য। মরক্কোর সমাজবিজ্ঞানী ফাতিমা মেরনিসি দেখিয়েছেন, এই হাদিসটি উটের যুদ্ধের প্রায় ২৫ বছর পর জনসমক্ষে আনা হয়েছিল। খলিফা ওমরের (রা.) আমলে 'মিথ্যা অপবাদের' দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত এবং সাক্ষ্যদানের অযোগ্য ঘোষিত একজন ব্যক্তির একক বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে অর্ধেক মানবজাতির রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে আজ বড় প্রশ্ন উঠেছে।
২. আয়েশা (রা.): প্রথম মুসলিম নারী সমালোচক ও 'ইসতিদরাক'
নারীর বুদ্ধি কম বা নেতৃত্বের যোগ্যতা নেই—এই পুরুষতান্ত্রিক বয়ানকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন স্বয়ং উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)। ইমাম যারকাশী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন কীভাবে আয়েশা (রা.) সমকালীন প্রভাবশালী পুরুষ সাহাবীদের ভুল সংশোধন করে দিতেন। এটি কেবল তথ্য সংশোধন ছিল না, ছিল প্রখর যুক্তিনির্ভর সমালোচনা।
অশুভ লক্ষণ ও নারী: আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছিলেন যে, "তিনটি জিনিসের মধ্যে অশুভ লক্ষণ আছে—ঘর, নারী ও ঘোড়া।" আয়েশা (রা.) এটি শুনে তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং বলেন, "রাসূল (সা.) এটি জাহেলিয়াতের যুগের মানুষের বিশ্বাস হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, তিনি নিজে এমনটি বলেননি।" তিনি যুক্তি দেন, এটি কোরআনের মৌলিক তাওহীদের পরিপন্থী।
নামাজ ও নারী: কিছু সাহাবী (আবু হুরায়রা ও ইবনে উমর) মনে করতেন, নামাজের সামনে দিয়ে নারী, কুকুর বা গাধা চলে গেলে নামাজ ভেঙে যায়। আয়েশা (রা.) ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, "তোমরা কি আমাদের (নারীদের) কুকুর ও গাধার সমতুল্য বানিয়ে দিলে?" এরপর তিনি বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা.) নামাজ পড়তেন আর তিনি তাঁর সামনেই শুয়ে থাকতেন।
মৃতের জন্য কান্না: ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছিলেন যে, স্বজনদের কান্নার কারণে মৃত ব্যক্তিকে কবরে আজাব দেওয়া হয়। আয়েশা (রা.) তৎক্ষণাৎ কোরআনের আয়াত দিয়ে তা খণ্ডন করেন: "কেউ কারো পাপের বোঝা বহন করবে না" (সুরা আন-নাজম: ৩৮)। তিনি বলেন, ইবনে উমর ভুল শুনেছেন বা প্রেক্ষাপট বোঝেননি।
৩. কোরআনের বয়ান: সাবার রানীর সফল নেতৃত্ব
হাদিসের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটকে 'চিরন্তন আইন' বানানোর চেষ্টায় আমরা প্রায়ই কোরআনের সুস্পষ্ট উদাহরণ ভুলে যাই। পবিত্র কোরআনে সাবার রানী বিলকিসের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে তিনি একজন প্রজ্ঞাবান, গণতান্ত্রিক ও দূরদর্শী শাসক।
পরামর্শভিত্তিক শাসন: তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরিষদের পরামর্শ নিতেন।
যুদ্ধ এড়ানোর কৌশল: সোলায়মানের (আ.) সাথে তাঁর সন্ধি ছিল রাজনৈতিক বিচঞ্চতার চরম নিদর্শন। কোরআন যদি নারী নেতৃত্বকে মজ্জাগতভাবেই 'অসফল' মনে করত, তবে বিলকিসের শাসনকে এত ইতিবাচকভাবে চিত্রিত করত না।
৪. আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা
সনাতনী আলেমদের অন্যতম দাবি হলো—নারীদের 'আকল' বা বুদ্ধি কম। কিন্তু আয়েশা (রা.)-এর এই জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াই প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় গভীরতা ও যুক্তিতে তিনি ছিলেন অনেক পুরুষ সাহাবীর চেয়েও অগ্রগামী। বর্তমানের প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা, যা কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের ওপর নির্ভরশীল নয়। খালেদ আবু এল ফাদল যেমনটি বলেছেন, ইসলামের মূল স্পিরিট হলো 'আদল' বা ন্যায়বিচার। যদি কোনো ব্যাখ্যা মানুষকে লিঙ্গীয় কারণে ছোট করে, তবে তা ইসলামের নৈতিক ভিত্তির সাথেই সাংঘর্ষিক।
উপসংহার
ইসলামি রাজনীতির সংস্কারের জন্য এখন সময় এসেছে সংস্কৃতি আর ধর্মকে আলাদা করার। মাওলানা আব্দুর রহীম বা তৎকালীন আলেমগণ তাঁদের সময়ের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে থেকে চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু আজকের পরিবর্তিত বিশ্বে 'সালাফীজমের' অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং কোরআনের সাম্য ও রাসূলের (সা.) কৌশলী বাস্তববাদিতার সমন্বয় প্রয়োজন। আয়েশা (রা.) আমাদের শিখিয়েছেন কেবল অন্ধভাবে অনুসরণ নয়, বরং জ্ঞান ও কোরআনের নিরিখে সবকিছু যাচাই করতে। এই সাহসী চিন্তাই পারে মুসলিম উম্মাহকে আধুনিক বিশ্বের যোগ্য নেতৃত্বে ফিরিয়ে আনতে।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
চেয়ারম্যান -বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র
চেয়ারম্যান - সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট
চেয়ারম্যান - ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)
চেয়ারম্যান - আলহাজ্ব কে,এম,আব্দুল কারীম রাহিমাহুল্লাহ ট্রাস্ট